শিশুর অবস্থান জানতে কোন ধরনের জিপিএস ট্র্যাকার ব্যবহার করবেন? জানুন বিস্তারিত

শিশুর জন্য জিপিএস ট্র্যাকার
শিশুর জন্য জিপিএস ট্র্যাকার | ছবি : সংগৃহীত
0

শিশু ঘরের বাইরে থাকলে সে ঠিক কোথায় আছে তা জানা থাকলে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কম থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নিখোঁজ ও অপ্রীতিকর ঘটনার খবরে অভিভাবকদের এ উদ্বেগ আরও বেড়েছে (Child GPS Tracker Guide Bangladesh)। এই পরিস্থিতিতে সন্তানের সার্বক্ষণিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা রাখতে ছোট জিপিএস ট্র্যাকার (Mini Portable GPS Tracker) ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শিশুদের জন্য ট্র্যাকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেবল দাম বা প্রযুক্তি দেখলে চলবে না; ডিভাইসটি ছোট, সহজে বহনযোগ্য এবং চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখা যায় কি না, তা দেখাও সমান জরুরি।

কারণ, শিশুর হাতে দামি বা নজরকাড়া স্মার্টওয়াচ থাকলে তা নিরাপত্তার বদলে উল্টো বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব ট্র্যাকার কীভাবে কাজ করে, কী সুবিধা দেয়, দেশে কী কী মডেল পাওয়া যায় এবং কেনার সময় কী খেয়াল রাখবেন তার বিস্তারিত জেনে নিন।

আরও পড়ুন:

জিপিএস ট্র্যাকারের সুবিধা (Benefits of GPS Tracker for Kids)

জিপিএস ট্র্যাকার মূলত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় করে নির্দিষ্ট প্রযুক্তির সাহায্যে অভিভাবকের ফোন বা অনলাইন ড্যাশবোর্ডে পাঠায়। এর প্রধান সুবিধাসমূহ হলো:

  • সর্বশেষ অবস্থান জানা (Live Location Tracking): শিশু বাইরে থাকা অবস্থায় তার রিয়্যাল-টাইম বা সর্বশেষ অবস্থান জানা যায়।
  • জিওফেন্স সতর্কবার্তা (Geofence Alert): বাসা বা স্কুলের মতো নির্ধারিত এলাকার সীমানা অতিক্রম করলে অভিভাবকের ফোনে অ্যালার্ট চলে আসে।
  • লোকেশন হিস্ট্রি (Location History): ডিভাইসগুলো আগের চলাচলের তথ্য সংরক্ষণ করে। ফলে শিশু কোন পথ দিয়ে কোথায় গেছে তার একটি স্পষ্ট ধারণা মেলে।
  • জরুরি এসওএস বাটন (Emergency SOS Button): বিপদে পড়লে শিশু বাটন চেপে অভিভাবকের ফোনে কল বা জরুরি বার্তা পাঠাতে পারে।

তবে মনে রাখা ভালো, জিপিএস ট্র্যাকার নিরাপত্তার শতভাগ নিশ্চয়তা নয়; এটি কেবল অতিরিক্ত একটি তথ্য সহায়তা মাত্র। চার্জ শেষ হওয়া, নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকা কিংবা ট্র্যাকারটি খুলে ফেলার মতো সীমাবদ্ধতা এতে থাকতে পারে।

আরও পড়ুন:

জিপিএস ট্র্যাকার কীভাবে কাজ করে? (How GPS Tracker Works)

জিপিএস স্যাটেলাইট সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে অনুসরণ করে না; বরং তা পৃথিবীর দিকে বেতার সংকেত পাঠায়। ট্র্যাকার সেই সংকেত গ্রহণ করে নিজের অবস্থান হিসাব করে।

এরপর সেই অবস্থান অভিভাবকের কাছে পাঠাতে ট্র্যাকারটি মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ফোর-জি সিম (4G SIM Card) ব্যবহার করে।

লোকেশন নির্ভুলতা সব জায়গায় এক নয়। খোলা আকাশের নিচে জিপিএস ডটগভ (GPS.gov) অনুযায়ী স্মার্টফোন বা ট্র্যাকার প্রায় ৪.৯ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে নির্ভুল অবস্থান দেখায়। তবে ভবন, গাছপালা, দেয়াল বা ঘরের ভেতরে এই সংকেত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

দেশের বাজারে পাওয়া যায় যেসব জিপিএস ট্র্যাকার (GPS Trackers Available in Bangladesh)

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ট্র্যাকার মিললেও সব ডিভাইস শিশুর বহনের উপযোগী নয়। দরদামের সম্ভাব্য ধারণাসহ প্রধান কিছু মডেল নিচে দেওয়া হলো:

  • ১. ছোট ও বহনযোগ্য ট্র্যাকার (GF-21 Mini Tracker): মাত্র ২০ গ্রাম ওজন ও ২.৫×৩.৫×১.৫ সেমি আকারের এই ডিভাইসটির দাম ৩,৩০০ টাকা। এতে জিপিএস, এজিপিএস, ওয়াই-ফাই, এলবিএস, জিওফেন্স ও এসওএস সুবিধা রয়েছে। ৪৫০ এমএএইচ ব্যাটারিতে ২-৩ দিন ব্যাকআপ মেলে। তবে এর লোকেশন অ্যাকুরেসি ৫০-৫০০ মিটার হতে পারে। ব্যাগে বা পোশাকে লুকিয়ে রাখা সহজ।
  • ২. সাইনোট্র্যাক এসটি-৯০৩ (SinoTrack ST-903): ৩,৪৫০ টাকা দামের এই ওয়াটারপ্রুফ ডিভাইসে ১,০৫০ এমএএইচ ব্যাটারি রয়েছে যা ২০ ঘণ্টা ট্র্যাকিং দেয়। এটি ব্যক্তি ও যানবাহন উভয়ের জন্য তৈরি, তাই বহনের উপযোগিতা পরখ করা জরুরি।
  • ৩. সাইনোট্র্যাক এসটি-৯১৫ (SinoTrack ST-915): ১০,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি ও ২০০ গ্রাম ওজনের এই ট্র্যাকারটির দাম ৬,৪৯৯ টাকা। এটি মূলত গাড়ি বা বাইকের জন্য তৈরি হওয়ায় আকারে বড় এবং শিশুর জন্য বহন করা কঠিন।
  • ৪. ইজিট্র্যাক্স পিএল২০০ কিডস ট্র্যাকার (EasyTrax PL200): সরাসরি শিশুদের জন্য বাজারজাত করা বিটিআরসি অনুমোদিত (BTRC Approved) এই ফোর-জি ডিভাইসটির দাম ৮,০০০ টাকা। এতে টু-ওয়ে কল, লাইভ ম্যাপ, ৯০ দিনের হিস্ট্রি ও ১ বছরের ওয়ারেন্টি রয়েছে।
  • ৫. স্মার্টওয়াচের ভেতরের ট্র্যাকার (Hoco Y108 4G Kids Smartwatch): ৩,৯৯০ টাকা দামের এই ঘড়িতে জিপিএস, ওয়াই-ফাই, এসওএস ও সিম কলিং সুবিধা রয়েছে। তবে হাতে দামি ঘড়ি দৃশ্যমান থাকায় তা অপরাধীদের নজরে আসার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন:

কেনার আগে যেসব বিষয় খেয়াল করবেন (Things to Check Before Buying)

শুধু দাম না দেখে কেনার আগে নিচের বিষয়গুলো মিলিয়ে নিন:

  • ফোর-জি বা আধুনিক মোবাইল নেটওয়ার্ক সাপোর্ট করে কি না।
  • জিপিএসের পাশাপাশি এলবিএস বা ওয়াই-ফাই পজিশনিং আছে কি না।
  • ব্যাটারির বাস্তব ব্যাকআপ এবং লোকেশন আপডেট দেওয়ার ঘনঘনত্ব।
  • লোকেশন হিস্ট্রি, জিওফেন্স অ্যালার্ট এবং এসওএস বোতামের উপস্থিতি।
  • ডিভাইসটি কতটা ছোট, হালকা এবং পানি/ঘাম প্রতিরোধী কি না।
  • ব্যবহৃত অ্যাপটি নিয়মিত আপডেট হয় কি না এবং সিম ও ডেটা ব্যবহারের অতিরিক্ত খরচ বা সার্ভিস চার্জ কেমন।
  • ডিভাইসটি দেশে ব্যবহারের জন্য বিটিআরসি অনুমোদিত কি না।

জিপিএস ট্র্যাকার ছাড়া বিকল্প প্রযুক্তি (Alternative Technologies for Tracking)

  • ব্লুটুথ ট্র্যাকার (Bluetooth Tracker - Apple AirTag / Android Find Hub): এয়ারট্যাগ বা অ্যান্ড্রয়েডের ট্যাগসমূহ খুব ছোট ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারিসম্পন্ন। এগুলো সরাসরি সিম বা জিপিএস ব্যবহার না করে আশপাশের অ্যাপল বা অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অবস্থান পাঠায়। তবে এটি জিপিএস ট্র্যাকারের সরাসরি বিকল্প নয়, বরং চাবি বা ব্যাগের মতো জিনিস খোঁজার জন্য বেশি উপযোগী।
  • স্মার্টফোন (Smartphone Location Sharing): বড় শিশুদের ক্ষেত্রে নিজের ফোনই লোকেশন শেয়ারিং হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে ব্যাটারি শেষ হওয়া বা ফোন হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
  • জিওফেন্সিং (Geofence Software Feature): এটি ট্র্যাকার বা ফোনে ব্যবহৃত সফটওয়্যার ফিচার, যা নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করে অ্যালার্ট দেয়।
  • স্কুল ও পারিবারিক নিরাপত্তাব্যবস্থা: স্কুলে প্রবেশ-প্রস্থানের পরিচয় যাচাই, নিরাপদ পিক-আপ, সিসিটিভি ইত্যাদি ব্যবস্থা প্রযুক্তির পাশাপাশি অপরিহার্য।

আরও পড়ুন:

ট্র্যাকার কোথায় ও কীভাবে রাখবেন? (Where & How to Place the Tracker)

ট্র্যাকারটি যেন সর্বদা চোখের আড়ালে থাকে এটিকে অগ্রাধিকার দিন। হাতে দৃশ্যমান বড় স্মার্টওয়াচ না দিয়ে শিশুর ব্যাগ, পোশাকের ভেতরের পকেট বা স্বাভাবিক ব্যবহারে মিশে যায় এমন জায়গায় ট্র্যাকার রাখা ভালো। তবে ডিভাইসটি যেন শরীরে আঘাত না করে, শ্বাসনালীতে ঝুঁকি না বাড়ায় বা সহজে হারিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। পাশাপাশি শিশুকেও ট্র্যাকারটি সম্পর্কে জানিয়ে রাখা ভালো, যাতে সে জরুরি সময়ে এসওএস বাটন ব্যবহার করতে পারে।

জিপিএস ট্র্যাকার সুরক্ষার শতভাগ নিশ্চয়তা না দিলেও, এটি একটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর (Extra Security Layer)। সঠিক ব্যাটারি ও নেটওয়ার্ক থাকলে এটি অন্তত এই গুরুত্বপূর্ণ উত্তরটি দিতে পারে "আমার সন্তানকে শেষ কোথায় দেখা গেছে?"






একনজরে: বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন প্রধান শিশু জিপিএস ট্র্যাকারসমূহ (Kids GPS Tracker Comparison)

জনপ্রিয় ট্র্যাকার মডেল, ফিচার, ব্যাটারি ব্যাকআপ ও আনুমানিক বাজার দর

মডেলের নাম (Model Name)

প্রধান ফিচারসমূহ (Key Features)

ব্যাটারি লাইফ (Battery)

আনুমানিক দাম (Price)

জিএফ-২১ (GF-21 Tracker)

অতি ক্ষুদ্র আকার (২০ গ্রাম), জিওফেন্স, এসওএস বাটন, লুকোনো সহজ

৪৫০ এমএএইচ (২-৩ দিন)

৩,৩০০ টাকা

সাইনোট্র্যাক এসটি-৯০৩ (SinoTrack ST-903)

ওয়াটারপ্রুফ (IP67), রিয়্যাল-টাইম ট্র্যাকিং, ভয়েস মনিটরিং

১,০৫০ এমএএইচ (২০ ঘণ্টা)

৩,৪৫০ টাকা

ইজিট্র্যাক্স পিএল২০০ (EasyTrax PL200 Kids)

ফোর-জি এলটিই (4G LTE), বিটিআরসি অনুমোদিত, টু-ওয়ে কল, ৯০ দিনের হিস্ট্রি

শিশুদের জন্য বিশেষায়িত

৮,০০০ টাকা

হোকো ওয়াই১০৮ স্মার্টওয়াচ (Hoco Y108 Smartwatch)

৪জি কিডস ওয়াচ, জিপিএস+ওয়াইফাই, এসওএস বাটন, সিম কলিং

৭৩০ এমএএইচ (১-২ দিন)

৩,৯৯০ টাকা

আরও পড়ুন:

শিশুর জন্য জিপিএস ট্র্যাকার (GPS Tracker for Kids Bangladesh), ছোট জিপিএস ট্র্যাকার দাম কত (Mini Hidden GPS Tracker Price BD), শিশুদের ট্র্যাকিং ডিভাইস (Child Location Tracking Device), ফোর জি কিডস স্মার্টওয়াচ (4G Smartwatch with GPS for Kids), বিটিআরসি অনুমোদিত জিপিএস ট্র্যাকার (BTRC Approved GPS Tracker BD)

এসআর