চ্যানেলে বিদেশি জাহাজের একেবারে কাছেই দিনদুপুরে জাল ফেলছেন জেলেরা। একটি-দুটি নয়, শত শত জেলে বিপজ্জনকভাবে জাল ছড়িয়ে দিচ্ছেন বহির্নোঙর থেকে কুতুবদিয়া ও হাতিয়া চ্যানেল পর্যন্ত। অথচ জাহাজ চলাচলের নির্ধারিত পথে জাল পাতা নিষিদ্ধ। অথচ সেই পথই এখন অনেকটা ঘিরে ফেলেছে মাছ ধরার জাল।
সম্প্রতি সন্দ্বীপ চ্যানেলে লাইটার জাহাজের সঙ্গে জেলেদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। গভীর সমুদ্রের এই পথ কার, জেলেদের না জাহাজ চলাচলের- এই নিয়ে বিরোধ। জাহাজ চালকদের অভিযোগ, বন্দরের নির্ধারিত নৌপথের বিভিন্ন অংশে জাল পেতে রাখায় ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে জাহাজ চলাচলের জায়গা। তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি। জাহাজের প্রপেলার ও রাডারে জাল জড়িয়ে অনেক সময় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইঞ্জিন। ঘটছে দুর্ঘটনাও।
বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, যে রুট দিয়ে আমরা যাব, ওই রুটে জেলেরা জাল পেতে রাখছে। আমি যখন যাচ্ছি, তখন প্রোপেলারের সাথে জাল প্যাঁচাচ্ছে, ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জাহাজ চড়ায় আটকে যাচ্ছে, জাহাজ ডুবে যাচ্ছে, চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
শিপিং খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে। জাহাজের মাস্টারদের মতে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক শিপিং মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মো. জসিম উদ্দিন বলেন, শ্রমিকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের নিরাপত্তার জন্য যদি তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে, বন্দর যদি বন্ধ করে দেয়, জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, মাল পরিবহন যদি বন্ধ করে দেয়, তার জন্য এটার দায় সম্পূর্ণ বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
সমস্যা সমাধানে বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছেন লাইটার জাহাজ চালকরা। এরমধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ১৭ আগস্ট থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
এরইমধ্যে চ্যানেল নিরাপদ রাখতে অভিযান শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড। চলছে জেলেদের আটক এবং জাল অপসারণের কার্যক্রম।
ধরা পড়া জেলেদের অনেকেই বলছেন, জীবিকার তাগিদেই তারা এখানে মাছ ধরেন। আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য এই নৌপথ কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কো সালাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ছোট ছোট যেসব বার্জগুলো আছে, আমাদের লাইটারেজ ভেসেলগুলো আছে, সেগুলো যদি টাইম মতো সেখানে পৌঁছতে না পারে—জাহাজের গোড়ায় যদি না যাইতে পারে, স্টেভিডোররা কিন্তু কার্গো ডিসচার্জ করতে সময় লেগে যায়। তাতে করে আল্টিমেটলি ওনাদের লস হচ্ছে, যারা কনসাইনি, কনসাইনির লস হচ্ছে, শিপারের লস হচ্ছে, রিসিভারের লস হচ্ছে—সবারই লস হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর লে. কমান্ডার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, যে সমস্ত সি-ফেয়ারার যারা আছেন, যে সমস্ত জাহাজি ভাইরা আছেন, তারা যেন নির্বিঘ্নে চট্টগ্রাম বন্দর এবং এই চ্যানেলে চলাফেরা করতে পারে, সে বিষয়টি আমরা এনসিওর করার জন্য আমরা চট্টগ্রাম বন্দর বদ্ধপরিকর।
বন্দরসীমা এবং জাহাজ চলাচলের রুট নিরাপদ রাখতে ভিটিএমআইএসের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের সমন্বিত টহল আরও বাড়ানোর তাগিদ শিপিংখাত সংশ্লিষ্টদের।





