রাজশাহীতে পদ্মার চর মাঝাড়দিয়াড়ে সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে বাল্যবিয়ে। চর নবীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই কন্যাশিশু, উচ্চ শিক্ষায় যারা খুবই আগ্রহী। তবে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুলেই বাল্যবিয়ের কবলে পড়ে হারাতে হচ্ছে শৈশব, শিক্ষাঙ্গন ও ভবিষ্যত স্বপ্ন।
চর নবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘অভিভাবকেরাই তাদের দ্রুত বিবাহ দিয়ে দেয়। কারণ উচ্চশিক্ষা করতে হলে এসএসসি লেভেলের স্কুল থাকার দরকার বা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থাকা দরকার, এখানে কিন্তু সেগুলো নাই।’
বর-কনে উভয়ের বয়স’ই ১৬ বছরের নিচে। রাখঢাক ছাড়াই বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত দুই পরিবার। । স্কুলের অভাবে উচ্চশিক্ষার আগ্রহকে চাপা দিয়ে বাবা-মার কথা রাখতে হয়েছে ১৪ বছরের মেয়েটিকে। তার মতো নূপুর ও মুক্তারও জীবনে একই ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যেকেই হয়েছেন সন্তানের মা। চরের গ্রামগুলোয় এসব স্বাভাবিক গল্প।
বাল্যবিয়ের শিকার হওয়ারা জানান, পড়াশোনা আর থাকার মতো জায়গা থাকায় অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এলাকার সবার।
কলেজ পর্যন্ত মেয়েদের বিন্যামূল্যে পড়ার সুযোগ রেখেছে সরকার। তবে, শহরে পড়ালেখার সুযোগ থাকলেও গ্রাম বা চরের সংকট আলাদা। সরকারি এ সুবিধা চরের মেয়ে শিশুদের জন্য কতোটা কাজে আসছে?
অভিভাবকরা জানান, পড়াশোনার জন্য ভালো স্কুল নাই, লেখাপড়া করার মতো পরিবেশ নাই, খেলার কোনো পরিবেশ নাই। তাই মেয়েদের তারাতারি বিয়ে দেয়া হচ্ছে।
যুব উন্নয়ন, সমাজ সেবা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কপোরেশনসহ ১০টি প্রতিষ্ঠান দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে। ১২টির অধিক এনজিও কাজ করছে নারী স্বাস্থ্য, বয়:সন্ধিকালীন স্বাস্থ্য নিয়ে।
এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগ, মহিলা অধিদপ্তরের ৮২টি বাল্যবিয়ে নিরোধ কমিটি ও ৭২টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব থাকলেও তাদের দেখা মেলে না চরাঞ্চলে। চরের বাল্যবিয়ে নিয়ে ইচ্ছে থাকলেও কিছু করতে পারেন না, ইউনিয়নের একমাত্র মেম্বার।
পবা হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বর হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি তো মেম্বার, আমার তো সচেতন করারও দরকার। তা আমি তো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিতে হয়, কোনো উপায় নাই। কেন জানি না, আমি ওই মেয়েটার তো গ্যারান্টিও নিতে পারছি না।’
যদিও মহিলা অধিদপ্তর বলছে, প্রতি মাসে ৭২টি ইউনিয়ন, ১০টি ওয়ার্ড ও ৫০টি হাবে বাল্যবিয়ে নিরোধ সভা করছেন তারা।
রাজশাহী মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচলাক ইসরাত জাহান বলেন, ‘তাদের আসলে মানে বাল্যবিয়ে হলে কি কুফলটা হচ্ছে, সেটা তারা বুঝতে পারছে না বা তাদের সেভাবে বোঝানো হচ্ছে না। যার জন্য যে অভিভাবক সমাবেশ বা যে আমরা যেটা করি যে উঠান বৈঠক।’
উন্নয়ন কর্মীরা বলছেন, সরকারি দপ্তরগুলোর উদাসিনতার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচী থেকে বঞ্চিত। ফলে বাল্যবিয়ের সুচকে এগিয়ে রাজশাহী।
এসিডির উন্নয়নকর্মী সুব্রত কুমার পাল বলেন, ‘মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের যে উপজেলা পর্যায়ের কিন্তু কর্মীর একটা ভয়ঙ্কর সংকট রয়েছে। আমরা এমনটাও দেখেছি যে একজন মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দুই থেকে তিনটা উপজেলারও দায়িত্ব পালন করেন।’
পরিবর্তন উন্নয়ন কর্মী রাশেদ রিপন বলেন,‘বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সামাজিক যে প্রতিরোধের জায়গাটা, সেটা কিন্তু আসলে সামগ্রিকভাবে কমে গেছে। আর সরকারি দপ্তরের যে কার্যক্রম, সেটা আসলে অনেক ক্ষেত্রে দায়সারা।’
আইনানুযায়ী বাল্যবিয়ের শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড। এ শাস্তি পিতামাতা বা বরকনে, এমনকি বিয়ে পড়ানো কাজীরও হতে পারে।
ইউনিসেফ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ এ রাজশাহীতে বাল্যবিয়ে বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। চরাঞ্চলে তার চেয়ে বেশি। তাহলে এর সচেতনতায় কাজ করা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম গুলো কতোটুকু সক্রিয়?

 and after images of the Betrawati area in Nepal-320x167.webp)



