বিচারিক রায়ের প্রতিবাদে কীভাবে এলো ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ শব্দবন্ধ

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: এআই জেনারেটেড
0

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতারা যখন নিজেদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—অন্যায় বা প্রহসনের বিচারের সঙ্গে নিরীহ এই প্রাণীর সম্পর্ক কী? ক্যাঙ্গারু তো বেশ শান্ত ও অলস স্বভাবের প্রাণী। এদের দলবদ্ধ রূপকে ইংরেজিতে ‘মব’ বলা হলেও এরা মোটেও দাঙ্গাবাজ নয়। তাহলে বিচারিক প্রহসনের কলঙ্ক কেন লেপে দেয়া হলো এই প্রাণীর গায়ে? শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে নানা বিভ্রান্তি ও ইতিহাস।

অক্সফোর্ডের দাবি ও কিছু সংশয়

গবেষকেরা সাধারণত এ জন্য অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিকে (ওইডি) দায়ী করেন। অক্সফোর্ডের ১৯৮৯ সালের দ্বিতীয় সংস্করণে বলা হয়েছে, এই শব্দবন্ধের উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে, যার অর্থ আইনি ভিত্তিহীন কোনো আদালত। এর প্রমাণ হিসেবে ১৮৫৩ সালে প্রকাশিত স্যামুয়েল অ্যাডামস হ্যামেটের লেখা ‘এ স্ট্রে আমেরিকান ইন প্যারিস’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক বইয়ের সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বইয়ে ক্যাঙ্গারু নামের একটি কাল্পনিক শহরের আদালতের প্রহসনমূলক বিচারের কথা বলা হয়েছিল। তবে অনেক গবেষকই অক্সফোর্ডের এই সূত্রকে প্রশ্নাতীত মনে করেন না।

ক্যালিফোর্নিয়ার গোল্ড রাশ ও লাফানোর তত্ত্ব

শব্দটির উৎস নিয়ে আরেকটি জনপ্রিয় তত্ত্ব রয়েছে ১৮৪৯ সালের ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশ বা সোনা অনুসন্ধানের সময়কালকে ঘিরে। সে সময় খনির মালিকানা দখল নিয়ে প্রচুর বিরোধ হতো। দ্রুত বিচার শেষ করতে তখন এক ধরনের অস্থায়ী আদালত বসানো হতো। ধারণা করা হয়, ক্যালিফোর্নিয়ায় আসা অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসীরা এই বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছিলেন অথবা তারা এর শিকার হয়েছিলেন। ফলে আমেরিকানরা ব্যঙ্গ করে একে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ নাম দেয়।

অন্য একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, এই আদালতগুলো যেহেতু আইনি নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে সরাসরি রায় বা সিদ্ধান্তে ‘লাফিয়ে’ পৌঁছাত, তাই লাফানোর স্বভাবের সঙ্গে মিলিয়ে একে ক্যাঙ্গারু কোর্ট বলা হতো।

পুরোনো নথিতে নতুন তথ্য

গবেষকেরা পুরোনো খবরের কাগজ ঘেঁটে দেখেছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার গোল্ড রাশ বা ১৮৫৩ সালের ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাসের অনেক আগেই এই শব্দটির ব্যবহার ছিল। নিউ অরলিন্সের একটি পত্রিকা ‘ডেইলি পিকায়ুন’ ১৮৪১ সালের ২৪ আগস্ট এক প্রতিবেদনে লিখেছিল, ‘গত সপ্তাহে ন্যাচেজ এলাকায় বিভিন্ন অভিযোগে ক্যাঙ্গারু কোর্টের মাধ্যমে বেশ কয়েকজন অপরাধীকে শাস্তি দেয়া হয়েছে।’ এছাড়া ১৮৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে ‘দ্য মিসিসিপিয়ান’ নামের আরেকটি পত্রিকায় তিন ব্যক্তির বিচারের প্রসঙ্গে ক্যাঙ্গারু কোর্টের অনুকরণে সভার উল্লেখ পাওয়া যায়।

এর থেকে বোঝা যায়, সোনার খনি আবিষ্কার কিংবা টেক্সাসের ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাসের বহু আগে থেকেই আমেরিকায় ক্যাঙ্গারু কোর্ট শব্দটি প্রচলিত ছিল।

অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটিশ সংযোগ

ক্যাঙ্গারুর আদি দেশ অস্ট্রেলিয়া হলেও সে দেশের সংবাদপত্রে ১৮৮১ সালের আগে এই শব্দের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। তখন সিডনির একটি পত্রিকায় ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপির শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া এক ধরনের নির্যাতনের বর্ণনায় শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্রগুলো একে আমেরিকার একটি নতুন সংস্কৃতি হিসেবেই বর্ণনা করতো।

তবে ১৮২৯ সালের ব্রিটিশ সামরিক নথিতে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ শব্দটির ব্যবহারের খোঁজ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, তৎকালীন পেনাল কলোনি বা বন্দিশালাগুলো নিয়ন্ত্রণকারী ব্রিটিশ বাহিনীর হাত ধরে এই শব্দটির জন্ম হয়ে থাকতে পারে।

শব্দতাত্ত্বিকদের মতে, ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ শব্দের প্রকৃত উৎস এখনো রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছে। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, বিচারিক প্রহসনের এই কুখ্যাতির পেছনে নিরীহ ও শান্ত প্রাণী ক্যাঙ্গারুর কোনো ভূমিকা ছিল না।

এএম