টিভি বা মনিটর কেন আড়াআড়ি মাপা হয়?

টিভি বা মনিটর স্ক্রিন মাপার নিয়ম
টিভি বা মনিটর স্ক্রিন মাপার নিয়ম | ছবি: সংগৃহীত
0

আমরা যখন বাজারে গিয়ে একটি ৫৫ ইঞ্চি স্মার্ট টিভি (Smart TV 55 Inch) কিংবা ডেস্কটপের জন্য একটি ২৭ ইঞ্চি মনিটর (27 Inch Monitor) কিনি, তখন মনের অজান্তেই ধরে নিই ডিসপ্লেটি হয়তো লম্বায় বা চওড়ায় তত ইঞ্চি। কিন্তু বাসায় এনে ফিতা দিয়ে মাপতেই অনেকের চোখ চড়কগাছ হয়ে যায়! দেখা যায়, চওড়ার মাপ কোনোভাবেই ওই ইঞ্চির সঙ্গে মিলছে না। আসলে, ডিসপ্লের এই ইঞ্চি বা সাইজটি কিন্তু স্ক্রিনের দৈর্ঘ্য কিংবা প্রস্থের মাপ নয়। এটি মূলত স্ক্রিনের ভেতরের এক কোণা থেকে বিপরীত কোণার আড়াআড়ি বা কোণাকুণি দূরত্ব (Diagonal Screen Size)।

স্ক্রিন চারকোনা হওয়া সত্ত্বেও কেন দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বাদ দিয়ে এই অদ্ভুত কোণাকুণি মাপার পদ্ধতি চালু হলো? এর পেছনে লুকিয়ে আছে জ্যামিতির প্রাচীন সূত্র এবং টেলিভিশনের আদি ইতিহাস।

আরও পড়ুন:

স্ক্রিন মাপার সঠিক পদ্ধতি ও পিথাগোরাসের ছোঁয়া (How to Measure TV Screen Size)

একটি টিভি বা মনিটরের স্ক্রিন সাইজ (TV Screen Size) বের করার জন্য এর বাইরের প্লাস্টিকের বর্ডার বা বেজেল বাদ দিয়ে শুধু সচল ডিসপ্লে বা কাচের অংশটুকু মাপতে হয়। ফিতা বা স্কেলটিকে স্ক্রিনের নিচের বাম কোণা থেকে টেনে ওপরের ডান কোণা (কিংবা নিচের ডান কোণা থেকে ওপরের বাম কোণা) পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে ধরলে যে ইঞ্চি পাওয়া যায়, সেটিই হলো ওই টিভির প্রকৃত সাইজ (Actual TV Size)।

ডিজিটাল স্ক্রিনগুলো চারকোনা আকৃতির হওয়ায় এখানে গণিতের খুব চেনা একটি সূত্র কাজ করে। স্কুলজীবনে পড়া জ্যামিতির পিথাগোরাসের সেই বিখ্যাত উপপাদ্যটি মনে আছে নিশ্চয়ই? সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রে সূত্রটি হলো a2 + b2 = c2 (2 স্কয়ার পড়ুন)

এখানে স্ক্রিনের অনুভূমিক দৈর্ঘ্য যদি a হয় এবং উল্লম্ব প্রস্থ যদি b হয়, তবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত কোণাকুণি দূরত্ব বা অতিভুজটি হলো c। ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলো এই চিরন্তন গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করেই তাদের ডিসপ্লের ইঞ্চি নির্ধারণ করে, যা স্ক্রিনের চারকোনা কাঠামোর ভেতরের সঠিক অনুপাত ধরে রাখতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন:

আড়াআড়ি মাপার ঐতিহাসিক কারণ (Why TV is Measured Diagonally)

আজকের দিনে আমরা যে আল্ট্রা-স্লিম বা পাতলা ওলেড (OLED TV) বা এলইডি স্ক্রিন (LED Screen) দেখি, টিভির শুরুর দিনগুলো কিন্তু এমন ছিল না। গত শতাব্দীর সিআরটি (CRT TV) বা ক্যাথোড রে-টিউব টিভির আমলে টিভির পেছনে বিশাল একটা বাক্স থাকত, যার মূল অংশ ছিল একটি কাচের পিকচার টিউব।

মজার বিষয় হলো, শুরুর দিকের সেই পিকচার টিউবগুলো পুরোপুরি চারকোনা হতো না; সেগুলো তৈরি হতো গোল বা ডিম্বাকৃতির বৃত্তাকার কাচ দিয়ে। যেহেতু টিউবটি গোল ছিল, তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক্স-রে প্লেট বা ল্যাবরেটরির গোলক মাপার মতোই বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে ওই বৃত্তের ব্যাস (Diameter) মেপে টিভির সাইজ নির্ধারণ করা হতো।

পরবর্তীতে প্রযুক্তির উন্নতি হয় এবং গোল টিউবের ওপর চারকোনা ফ্রেম বসিয়ে কিংবা স্ক্রিনকে পুরোপুরি আয়তাকার রূপ দিয়ে বাজারে টিভি আসতে শুরু করে। তবে তত দিনে ক্রেতা এবং নির্মাতা উভয় পক্ষের মধ্যেই ‘ব্যাস’ বা কোণাকুণি মাপার বিষয়টি একটি বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড বা ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সেই বৃত্তাকার ব্যাসের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই চারকোনা স্ক্রিনের যুগেও এক কোণা থেকে অন্য কোণার দূরত্ব মাপার পদ্ধতিটি রেখে দেয়া হয়।

আরও পড়ুন:

অ্যাসপেক্ট রেশিও ও বিভ্রান্তি এড়ানো (TV Aspect Ratio Guide)

যদি কোণাকুণি না মেপে শুধু দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ মেপে টিভির সাইজ বলা হতো, তবে বর্তমান বাজারে ডিসপ্লে কেনাটা ক্রেতাদের জন্য এক চরম গোলকধাঁধা বা বিভ্রান্তির কারণ হতো। এর পেছনে রয়েছে ‘অ্যাসপেক্ট রেশিও’ (Aspect Ratio) বা স্ক্রিনের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত।

পুরনো দিনের ডাব্বা টিভিগুলোর অনুপাত ছিল ৪:৩ (4:3 Aspect Ratio), অর্থাৎ স্ক্রিনটি ছিল অনেকটাই বর্গাকার। বর্তমানের স্ট্যান্ডার্ড টিভি বা মনিটরের অনুপাত ১৬:৯ (16:9 Aspect Ratio), যা বেশ চওড়া। আবার গেমার বা সিনেমাপ্রেমীদের জন্য বাজারে এখন পাওয়া যায় আল্ট্রাওয়াইড মনিটর (Ultrawide Monitor), যার অনুপাত ২১:৯ (21:9 Aspect Ratio)।

এখন ধরুন, দুটি ভিন্ন আকৃতির মনিটরের চওড়া বা দৈর্ঘ্য সমান ২৪ ইঞ্চি। কিন্তু তাদের একটি ১৬:৯ অনুপাতের এবং অন্যটি ২১:৯ অনুপাতের আল্ট্রাওয়াইড। যদি শুধু দৈর্ঘ্য মেপে বাজারে বিক্রি হতো, তবে দুটিকেই ‘২৪ ইঞ্চি মনিটর’ (24 Inch Monitor) বলতে হতো। অথচ আল্ট্রাওয়াইড মনিটরটির উচ্চতা কম হওয়ায় তার ভেতরের স্ক্রিন এরিয়া বা কাচের আয়তন ১৬:৯ মনিটরের চেয়ে অনেক কম হবে! আড়াআড়ি বা ডায়াগোনাল মাপার পদ্ধতি (Diagonal Measurement System) এই বিভ্রান্তি দূর করেছে। এটি নিশ্চিত করে যে, অ্যাসপেক্ট রেশিও যাই হোক না কেন, ক্রেতা নির্দিষ্ট ইঞ্চির বিপরীতে সঠিক কোণাকুণি ক্ষেত্রফল পাচ্ছেন কি না।

আরও পড়ুন:

ভোক্তা বা ক্রেতাদের জন্য সচেতনতা গাইডলাইন (TV Buying Guide for Beginners)

নতুন টিভি বা মনিটর কেনার সময় (Buying New TV or Monitor) শুধু কত ‘ইঞ্চি’ বড় তা দেখে লাফিয়ে পড়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। একটি আদর্শ ডিসপ্লে বেছে নিতে ইঞ্চির পাশাপাশি আরও দুটি জিনিস দেখা অত্যন্ত জরুরি।

  • অ্যাসপেক্ট রেশিও (Aspect Ratio): আপনি যদি সাধারণ অফিসিয়াল কাজ, পড়াশোনা বা টিভি দেখার জন্য কেনেন, তবে ১৬:৯ অনুপাতই সবচেয়ে ভালো। আর যদি ভিডিও এডিটিং বা একই সাথে একাধিক উইন্ডো খুলে কাজ করতে চান, তবে ২১:৯ বা আল্ট্রাওয়াইড ডিসপ্লে (Ultrawide Display) বেছে নিন।
  • রেজোলিউশন (Screen Resolution): শুধু বড় ইঞ্চি হলেই ছবি সুন্দর দেখায় না, যদি না তার রেজোলিউশন ভালো হয়। যেমন একটি ২৪ ইঞ্চি মনিটরের জন্য ফুল এইচডি (1080p Full HD Resolution) রেজোলিউশন দারুণ। কিন্তু আপনি যদি ২৭ ইঞ্চি বা তার বড় মনিটর কিংবা বড় টিভি কেনেন, তবে অবশ্যই ২কে (2K Resolution) বা ৪কে রেজোলিউশন (4K Ultra HD Resolution) দেখে নেয়া উচিত। অন্যথায় স্ক্রিনের পিক্সেলগুলো ফেটে ছবি ঝাপসা দেখাতে পারে।

আরও পড়ুন:

এনএইচ