কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ; স্থল অভিযানেই নামছে ওয়াশিংটন?

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: সংগৃহীত
0

ইরানের খার্গ দ্বীপে বিমান হামলার দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিলে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডনের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল (শুক্রবার, ১৩ মার্চ) ট্রুথ সোশ্যালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্টটি শুধু রাজনৈতিক বার্তা ছিল না, বরং বড় ধরনের মার্কিন সামরিক অভিযানের ঘোষণাও ছিল। সেখানে তিনি লিখেছেন, তার নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী বোমা হামলা চালিয়ে ইরানের ‘মুকুটের রত্ন’ খ্যাত খার্গ দ্বীপের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে।

খার্গ দ্বীপ ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বাইরে, হরমুজ প্রণালির উত্তরাংশে অবস্থিত একটি ছোট প্রবালদ্বীপ। এটি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদগুলোর একটি, কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এ দ্বীপের টার্মিনাল থেকে জাহাজে তোলা হয়।

এ কারণে খার্গ যেমন ইরানের ‘মুকুটের রত্ন’, তেমনি কৌশলগত দিকে থেকে ‘অ্যাকিলিসের গোড়ালি’ও। এই একক চোকপয়েন্টে বিঘ্ন ঘটলে তেহরানের তেলনির্ভর অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে এবং সামরিক ব্যয় বহনের সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে।

ট্রাম্প গতকাল ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘পৃথিবী যা এখন পর্যন্ত দেখেছে, তার মধ্যে আমাদের অস্ত্র সবচেয়ে শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক।’

একই সঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, ‘শালীনতার কারণে আমি দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়।

আরও পড়ুন:

পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘তবে ইরান, অথবা অন্য কেউ, যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে আমি অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যেটাতে হামলা করতে চায়, সেটা রক্ষার কোনো সক্ষমতাই ইরানের নেই।’ একই পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরান আর কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বকে হুমকি দেয়ার সক্ষমতাও তাদের থাকবে না। তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র নামিয়ে রাখার আহ্বানও জানান।

পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘ইরানের পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল ও ইসরাইলকে ধ্বংসের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সেই পরিকল্পনা এখন প্রায় মৃত।’

ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের পোস্ট |ছবি: ট্রুথ সোশ্যাল

ট্রাম্পের বার্তার কড়া ভাষাকে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও গণমাধ্যম পর্যবেক্ষকেরা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মেরিন পাঠানোর খবরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। তবে তাদের মতে, এ অঞ্চলে মোতায়েন হওয়া মেরিনরা মূলত ঘাঁটি শক্তিশালী করা; বন্দর সুরক্ষিত রাখা এবং সমুদ্রপথ রক্ষার মতো কাজে কার্যকর। তাই শুধু এই মোতায়েনকে স্থল আগ্রাসনের প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না।

পর্যবেক্ষকদের যুক্তি, ৮ কোটির বেশি জনসংখ্যা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির ইরানে প্রচলিত ধরনের স্থল আগ্রাসন চালাতে আরও বড় সেনা সমাবেশ, টেকসই সরবরাহব্যবস্থা এবং বিস্তৃত রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন। তাদের মতে, খার্গ দ্বীপে হামলা দেখায় যে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি তার জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির মেরুদণ্ডেও আঘাত হানতে প্রস্তুত। তবে এটিও এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যা স্থল হামলাকে আসন্ন বলে নিশ্চিত করে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ও হরমুজ নিয়ে তার শর্তসাপেক্ষ হুমকি ‘বাধ্যতামূলক উত্তেজনা বৃদ্ধির’ কৌশল—অর্থাৎ শাসন পরিবর্তনের ঘোষণা ছাড়াই চাপ সৃষ্টি এবং স্থলে সেনা না নামিয়েই শক্তি প্রদর্শন। তারা আরও ধারণা করছেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর বড় পরিসরের হামলা চালায় বা দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখে, তবেই স্থল আগ্রাসনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রাশিয়ার তত্ত্বাবধানে নেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প তা নাকচ করে দেন। এতে ইঙ্গিত মিলেছে, ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক উপাদান কোনো তৃতীয় পক্ষের নিয়ন্ত্রণে দিতে চায় না এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার বড় ভূমিকা মেনে নিতে অনিচ্ছুক।

এএম