গত জানুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর জ্বালানি তেল অবরোধ আরোপ করে। এর পর থেকেই কিউবায় দিনে ১৫ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না, দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এই পরিস্থিতি সালভার মতো ছোট পারিবারিক ব্যবসার জন্য এক ভয়াবহ ধাক্কা হয়ে এসেছে।
হাভানার রেগলা এলাকায় ওশির মূল রেস্তোরাঁটি ছিল। সেখানে বিকল্প হিসেবে একটি জেনারেটর থাকলেও তা চালানোর সামর্থ্য সালভার নেই। চলতি বছরের শুরুতে এক লিটার পেট্রলের দাম ছিল ১ ডলার, যা এখন কালোবাজারে ১০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। মার্কিন অবরোধ মোকাবিলায় জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে কিউবা সরকার ডিজেল বিক্রি বাতিল এবং পেট্রল রেশনিং শুরু করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়। বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়ে সালভা বলেন, ‘আমি দিন কাটিয়েছি শুধু কেঁদে কেঁদে।’
ওশির ঠিক বিপরীতে ‘পিঞ্চার্তে’ নামের আরেকটি দোকানে বিক্রি হচ্ছিল ফ্রাইড রাইস ও কাঠকয়লায় পোড়ানো মাংস। তাদের কোনো স্থায়ী দোকান নেই, ডিজেলচালিত বড় ট্রাকে করে ওভেন ও ফ্রিজ নিয়ে মেলায় মেলায় ঘুরে খাবার বিক্রি করে তারা। প্রতিষ্ঠানটির সহস্বত্বাধিকারী ৩১ বছর বয়সী এলিয়ানিস আগুয়েরো বলেন, ‘জ্বালানি ছাড়া আমাদের খরচ আট গুণ বেড়ে গেছে।
জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল কোনো ব্যবসাই এখন আর লাভজনক নেই।’ সংকট কাটাতে ওশি ও পিঞ্চার্তে—উভয় প্রতিষ্ঠানই সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকতে চাইছে। কিন্তু চাহিদার কারণে বৈদ্যুতিক ট্রাইসাইকেলের দামও ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। সালভা বলেন, ‘এ বছরটি হবে কেবল টিকে থাকার লড়াই।’
কোটা নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট ৪১ বছর বয়সী এরিক আলমিডা বলেন, ‘এই তেল অবরোধ কিউবার পুরো বেসরকারি খাতকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে।’ আগে বন্দর থেকে হাভানায় একটি কনটেইনার আনতে খরচ হতো ১০০ থেকে ১৫০ ডলার, এখন তা ৬০০ ডলারের নিচে নামছে না। তিনি জানান, তেলের সংকটে তাঁর নিজস্ব আয়ও এ বছর ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
তবে এই সংকটের একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বাধ্য হয়ে কিউবা সরকার বেসরকারি খাতের ওপর নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল করতে শুরু করেছে। গত তিন মাসে সরকার বেসরকারি খাতের জন্য নতুন বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌর প্যানেল আমদানিতে কর ছাড় এবং বিদেশে বসবাসরত কিউবানদের দেশে ছোট ও মাঝারি আকারের (এসএমই) ব্যবসা খোলার অনুমতি। এ ছাড়া কৃষিপণ্য বিপণন এবং রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সঙ্গে মিলে বেসরকারি খাতের যৌথ বিনিয়োগেরও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামরিক খাত এখনো সরকারি নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
২০২১ সালে কিউবায় বেসরকারি খাতের বিকাশ শুরু হয়। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১০ হাজার এসএমই চালু রয়েছে, যা জাতীয় কর্মসংস্থানের ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এবং জিডিপির ১৫ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। আলমিডা বলেন, ‘কিউবার বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ও সৃজনশীলতার ওপর ভর করেই টিকে আছে।’
এদিকে, গত ৬ ফেব্রুয়ারি কিউবা সরকার বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে জ্বালানি আমদানির অনুমতি দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও কিউবার কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে তেল দেওয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। কিন্তু এর পরিমাণ খুবই সামান্য। রয়টার্সের মতে, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বেসরকারি খাত মাত্র ৩০ হাজার ব্যারেল জ্বালানি আমদানি করেছে। যেখানে প্রতিদিন কিউবার প্রয়োজন প্রায় ১ লাখ ব্যারেল।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জ্বালানি আমদানি কিছুটা লাভজনক হলেও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সে সামর্থ্য নেই। একটি ট্যাংক আমদানি করতে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার ডলার, যা এককভাবে কোনো ছোট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। আবার যৌথভাবে আমদানি বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রেও রয়েছে সরকারি কড়াকড়ি।
গত বছর পিঞ্চার্তে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বড় করার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু এখন আগুয়েরোর সেই স্বপ্ন পরিণত হয়েছে কেবল টিকে থাকার সংগ্রামে। তিনি বলেন, ‘যেভাবেই হোক না কেন, বেসরকারি খাতের জন্য ভেসে থাকাটা এখন খুব কঠিন হতে যাচ্ছে।’





