পোল্যান্ড জানিয়েছে, আগস্টে তারা ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত এক মার্কিন নাগরিকের ওপর রাশিয়ার নির্দেশে চালানো একটি হত্যাচেষ্টা ব্যর্থ করেছে। অন্যদিকে এস্তোনিয়া এক ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের পেছনে মস্কোর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। এদিকে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ২৫ আগস্ট বলেছেন, হাইব্রিড হামলার জন্য দায়ীদের ‘দাম দিতে হবে’। লাইপজিগের একটি বিমানবন্দরে ইউক্রেনীয় কার্গো প্লেনের কাছে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন উদ্ধারের পর এই মন্তব্য করেন তিনি। এ ঘটনা মস্কোর হামলার চেষ্টা নিয়ে জল্পনা তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরেই আশঙ্কা করছিলেন যে রাশিয়া মহাদেশটির বিরুদ্ধে তার আগ্রাসী অভিযান বাড়াতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। যারা ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরের হুমকি মোকাবিলার পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত, তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই তথ্য জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুর্বলতা মস্কোকে আরও সাহস দিয়েছে। ইউক্রেনের সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধে আবদ্ধ থাকা রাশিয়া পশ্চিমা মিত্রদের কতটা ভয় দেখাতে ও ক্লান্ত করতে পারে, তা পরখ করছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ভিলনিয়াসে নন-রেসিডেন্ট ফেলো অগ্নিয়া গ্রিগাস বলেন, ‘ন্যাটো, ইউরোপীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিক্রিয়াগুলো মূলত প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিরক্ষামূলক হয়েছে। তারা পৃথক উসকানিগুলো শনাক্ত ও মোকাবিলায় মনোযোগ দিয়েছে, কিন্তু মস্কোকে এ কাজে নিরুৎসাহিত করে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।’
যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে সরে আসায় ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ার প্রধান ভূমিকা এখন ইউরোপের ওপরই পড়েছে।
ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলো হামলার শিকার হলে একে অপরকে সাহায্য করতে বাধ্য। তবে রাশিয়ার এসব কর্মকাণ্ড এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যা ন্যাটোর সামরিক প্রতিক্রিয়া ট্রিগার করতে পারে। ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের পর বিপুলসংখ্যক কূটনীতিককে বহিষ্কার করার পর থেকে নাশকতাকারী নিয়োগে সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগাচ্ছে মস্কো।
ব্রিটেনে জুন মাসে দুই ইউক্রেনীয় নাগরিককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের গাড়ি ও সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগের ষড়যন্ত্রের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়। মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশন জানায়, রুশভাষী টেলিগ্রাম ব্যবহারকারী একজনের মাধ্যমে অনলাইনে নিয়োগ পেয়েছিলেন একজন অপরাধী।
লিথুয়ানিয়ার প্রধান প্রসিকিউটর নিদা গ্রুনস্কিয়েনে গত সপ্তাহে জানান, জার্মানিতে ড্রোন হামলার ঘটনার সঙ্গে ২০২৪ সালে ডিএইচএল কার্গো প্লেনে বিস্ফোরক প্যাকেট পাঠানোর চেষ্টার তদন্তের ‘যোগসূত্র’ রয়েছে। এ নাশকতার চেষ্টায় লিথুয়ানিয়া পাঁচজনকে অভিযুক্ত করেছে, যাদের রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা নিয়োগ দিয়েছিল বলে দাবি।
জার্মানি যদিও সশস্ত্র ড্রোনের পেছনে রাশিয়ার নাম সরাসরি বলেনি বা বার্লিনের উপকণ্ঠে অস্ত্রের মজুত উদ্ধারের ঘটনায়ও বলেনি, তবে একাধিক সংবাদমাধ্যমের তদন্ত প্রতিবেদনে মস্কোর দিকে আঙুল উঠেছে। এতে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিকে অপ্রতিসম ঝুঁকির নতুন মাত্রা মোকাবিলার সতর্কতা জোরদার হয়েছে।
ব্লুমবার্গকে আগস্টে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, রুশ গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বাল্টিক দেশ ও পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে হাইব্রিড যুদ্ধের অপারেশন নিয়ে পরিকল্পনা করছে। লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রোবের্তাস কাউনাস বলেছেন, বাল্টিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার জন্য বন্দি ইউক্রেনীয় ড্রোন ব্যবহার করে মস্কো ফলস ফ্ল্যাগ অভিযান চালানোর সম্ভাবনা যাচাই করছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের ভূ-অর্থনীতি বিশ্লেষক অ্যালেক্স ককচারভ বলেন, ‘ইউরোপে রাশিয়ার চলমান হাইব্রিড যুদ্ধ অত্যন্ত সমন্বিত, থ্রেশহোল্ডের নিচে থাকা একটি অভিযান। এর লক্ষ্য পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করা, ন্যাটো ও ইইউ-এর ঐক্য ভাঙা এবং ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন হ্রাস করা। এই লক্ষ্য অর্জনে ক্রেমলিন বেনামি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাজে লাগিয়ে প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতা গোপন রাখে—যাতে অস্বীকার করার সুযোগ থাকে।’





