দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের পেরিয়েছে ছয়দিন। কিন্তু কাটেনি বিস্ময়। শান্ত-সুনিবিড় হিমালয়কন্যা এখন স্রেফ কাদামাটির স্তূপ। প্রলয়ঙ্করী ঢলে মাটির সাথে মিশে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত কতটা ভয়াবহ, তা কেবল জানেন ত্রিশূলীর তীরে ফিরতে থাকা বাসিন্দারা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, একটা খাবারের, আরেকটা কাপড়ের দোকান ছিলো। সব শেষ। আমি শেষ হয়ে গেছি। পথের ফকির হয়ে গেছি। ঈশ্বর দিয়েছিলেন, তিনিই সব নিয়ে গেলেন। আমার খাওয়ার কিছু নেই। ঘুমানোর জায়গা নেই। ঘরের শুধু কঙ্কালটা দাঁড়িয়ে আছে।
আকস্মিক বন্যা প্রথম আঘাত হানে যে চিৎওয়ানে, সেখানে নদীর তীরে ভেসে এসেছে প্রায় ৩শ' মরদেহ। ত্রিশূলী আর ভোটেকোশি নদীর তীরজুড়ে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। জায়গা অপ্রতুল বলে মৃতদেহ সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না, শেষ উপায় হিসেবে সাময়িক সমাধি বেছে নিয়েছে প্রশাসন। কিন্তু কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃতদেহের পরিচয় শনাক্তের কাজ। উদ্ধারকৃত হাজারখানেক মরদেহের মধ্যে অর্ধশত মানুষের পরিচয়ও নিশ্চিত করা যায়নি এ অবস্থায় পরবর্তীতে স্বজনদের দাবির প্রেক্ষিতে অজ্ঞাত মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিতে ডিএনএ সংগ্রহ করে রাখছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।
স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, ১৯৯টি মরদেহ এই অস্থায়ী গোরস্থানে সমাহিত করা গেছে। আরও ৮০টি আজকেই সমাহিত করা হবে। মরদেহ পচতে শুরু করায় বাধ্য হয়ে এ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
অন্যদিকে, ঘড়ির কাঁটা এগোনোর সাথে ম্লান হচ্ছে ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়া কয়েক হাজার নিখোঁজ মানুষকে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে আংশিক বা পুরোপুরি বিধ্বস্ত ১১টি পানি ও একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গগুলোতে আটকে পড়া ৩শ'র বেশি মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে ৬শ'র বেশি। তাদের খবর পাওয়ার অপেক্ষায় হাজারও স্বজন। এ পর্যায়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের দুর্গম গিরিখাত।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোক বাহাদুর পৌডেল ছেত্রি বলেন, এটা হিমালয়, সরু গিরিখাতের কারণে এলাকাটি খুবই দুর্গম। এ কারণেই যেকোনো উদ্ধার বা ত্রাণ অভিযান শুরু করার আগে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক ও সাবধান থাকতে হয়। তার ওপর এদিকের গিরিখাতটি সত্যি গভীর এবং খাড়া। এটাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক বাধা।
এ অবস্থায় প্রতিবেশী চীন-ভারতের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া আর অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় নেপালের ২১ হাজার সামরিক কর্মকর্তার বিশাল দল উদ্ধার প্রচেষ্টা জোরদার করলেও হালে পানি পাচ্ছে না। সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের অনেকেই বেঁচে থাকতে পারেন ধরে নিয়ে তাদের কাছে পৌঁছাতে সোমবার ত্রিশূলী থ্রি-এ প্রকল্পে ডিনামাইট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটানো হয় পাহাড়ে। পাম্পের মাধ্যমে ভেতরের বাতাস চলাচল অব্যাহত রাখারও চেষ্টা চলছে।
উদ্ধারকারীরা বলেন, সুড়ঙ্গের দুর্যোগ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা আছে আমাদের। থ্রি-এ'র ভেতরে আড়াই কিলোমিটার জুড়ে অনুসন্ধান চালিয়েও জীবিত কারও সন্ধান পাইনি।
সীমান্তের ওপারে চীন নিয়ন্ত্রিত তিব্বতেও চলছে সন্ধান ও উদ্ধার অভিযান। প্রাণ শনাক্তকারী যন্ত্র, ড্রোন, স্যাটেলাইট ফোন, সামরিক হেলিকপ্টার দিয়ে জিরংয়ে দুর্যোগের কেন্দ্রে চলছে তৎপরতা, এক সপ্তাহেও মেলেনি একটি প্রাণের চিহ্ন। কাদামাটির স্তূপ থেকে বেরিয়ে আসছে শিশুদের খাবার, পোশাক ইত্যাদি। আঞ্চলিক সরকারের তথ্য অনুযায়ী ১৬ মৃত্যু ও সাড়ে ৫শ' নিখোঁজে হতাহতের সংখ্যা আটকে থাকলেও, তথ্যপ্রবাহে বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণের কারণে জানা যাচ্ছে না জিরং বন্দর এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতি।





