চীনা নাগরিকদের বিদেশযাত্রায় নতুন বিধিনিষেধ

চীনা নাগরিক
চীনা নাগরিক | ছবি: সংগৃহীত
0

জাতীয় নিরাপত্তা বা স্বার্থের ক্ষতি করেছেন বলে বিবেচিত চীনা নাগরিকদের বিদেশযাত্রায় সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিধান রেখে নতুন বিধিনিষেধ জারি করেছে চীন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এর ফলে নাগরিকদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।

আজ (মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর) বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আইনে শুধু জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়, চীনের শিল্প ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদেরও বিদেশযাত্রায় বাধা দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো কৌশলগত খাতে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যে এ বিধিনিষেধকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর আগে, এসব খাতের কয়েকজন নির্বাহীর ওপরও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়। চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যানাসের দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতা গত মার্চে দেশ ছাড়তে পারেননি বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরে প্রতিষ্ঠানটি মেটা অধিগ্রহণ করে।

নতুন নিয়মে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত দেশ ও অঞ্চলে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। সীমান্ত কর্মকর্তাদের চীনা নাগরিকদের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।

তবে নতুন বিধিনিষেধ ঘোষণার আগেও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বিদেশযাত্রায় নিয়ন্ত্রণ ছিল। প্রথম দিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসেন। পরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও তা বিস্তৃত হয়।

বিবিসি চায়নিজকে আনহুই প্রদেশের এক অবসরপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা জানান, প্রায় ২০১৮ সাল থেকে তার কর্মস্থলের কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট জমা দিতে হতো। গত বছর অবসর নেয়ার পরও তার পাসপোর্ট সাবেক কর্মস্থলের হেফাজতে রয়েছে বলে জানান তিনি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে যেতে হলে কর্মীদের আবেদন করে ভ্রমণের কারণ জানাতে হতো। সব আবেদন অনুমোদন করা হতো না। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আবেদন পর্যটনের তুলনায় বেশি অনুমোদন পেত বলেও জানান তিনি।

তার ভাষ্য, মূলত দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের দেশ ছেড়ে পালানো বা বিদেশে সম্পদ সরিয়ে নেয়া ঠেকাতেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। তবে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস ঠেকানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হতে পারে।

বেইজিংয়ের একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৩২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যাকে বিবিসি চায়নিজ ‘শিয়াও ওয়াং’ ছদ্মনামে উল্লেখ করেছে, জানান, তার সহকর্মীদের দীর্ঘদিন ধরে পাসপোর্ট জমা দিতে এবং বিদেশ যাওয়ার আগে অনুমোদন নিতে হয়। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তারা মৌখিকভাবে কর্মীদের জাপানের মতো ‘সংবেদনশীল’ দেশে ভ্রমণ না করার জন্য সতর্ক করেছেন বলেও জানান তিনি।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এশিয়ান ল-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক টম কেলগ বিবিসি চায়নিজকে বলেন, বিদেশযাত্রায় নিয়ন্ত্রণের এ বিস্তার ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’। তার মতে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমলে দেশে বাড়তে থাকা আদর্শিক নিয়ন্ত্রণের প্রতিফলন এসব বিধিনিষেধে দেখা যাচ্ছে।

তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে মাও সেতুংয়ের আমলের সঙ্গে তুলনা করেন। মাওয়ের কয়েক দশকের শাসনামলে চীন অনেকটাই বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।

পরবর্তী সময়ে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির ফলে ১৯৯০-এর দশকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ধীরে ধীরে চীনা নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। কেলগের মতে, বর্তমানের বিভিন্ন ভ্রমণ বিধিনিষেধ সেই ‘বেদনাদায়ক যুগের’ স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।

এএইচ