৯ দশক পর প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড; কেন আবার একই পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র

১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকিতে রেইনি বেথিয়ার প্রকাশ্য ফাঁসি দেখতে আনুমানিক ২০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন
১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকিতে রেইনি বেথিয়ার প্রকাশ্য ফাঁসি দেখতে আনুমানিক ২০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন | ছবি: সংগৃহীত
0

প্রায় এক শতাব্দী আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, ফোর্ট হুড সেনা ঘাঁটিতে হামলাকারী নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার (লাইভ স্ট্রিম) করা হবে। এমন সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, ৯ দশক পর কেন আবার একই পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র?

প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কেন ফিরিয়ে আনা হচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি ঘোষণা দেন, আগামী ডিসেম্বরে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে এবং তা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাকে হত্যার দায়ে নিদাল হাসানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ হিসেবে পিট হেগসেথ বলেন, ‘মানুষের বোঝা দরকার যে এ ধরনের কাজের মারাত্মক পরিণতি রয়েছে।’

ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজ মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক কার্ট গ্রে মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির বর্তমান মেরুকরণ এমন ঘোষণার ক্ষেত্র তৈরি করে থাকতে পারে। তিনি বলেন, কিছু মানুষ হয়তো রক্তপাত দেখতে চায়, তবে অনেকেই এখন অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়েছে। তারা সরাসরি সম্প্রচারের আনন্দে মেতে উঠবে তা নয়; বরং তারা ভাবছে, পরিস্থিতি হয়তো এখন এমনই।

অতীতে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের পরিণতি কী হয়েছিল

১৯৩৬ সালের ১৪ আগস্ট কেন্টাকির ওয়েন্সবোরোতে রেইনি বেথিয়া নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ৭০ বছর বয়সি এক শ্বেতাঙ্গ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে তাকে এই সাজা দেয়া হয়েছিল। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের মধ্যে সেদিন ভোর ৫টায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই ফাঁসি দেখতে জড়ো হয়েছিলেন। মানুষের এই ভিড় ও উন্মাদনা এতটাই সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল যে, এর ঠিক ১৮ মাসের মাথায় কেন্টাকির গভর্নর প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড বেআইনি ঘোষণা করেন।

১৯ ৩৭ সালে মিসৌরিতে অল্প কয়েকজনের উপস্থিতিতে আরেকটি ফাঁসি কার্যকর করা হলেও, বেথিয়ার মৃত্যুই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ আলোচিত প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড।

আমেরিকানরা এখন কী ভাবছেন

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মাইকেল র‍্যাডেলেট এই ঘোষণায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের প্রতি জনসমর্থন ১৯৯৪ সালের ৮০ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৫২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বেথিয়ার ফাঁসি নিয়ে বই লেখা লেখিকা সোনিয়া লি এই ঘোষণাকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৩৬ সালের ওই ঘটনাকে বিকৃত উল্লাসের উৎসব বলা হয়েছিল।

ইউএস কনফারেন্স অব ক্যাথলিক বিশপের প্রধান শুক্রবার সকালে এই ঘোষণাকে ‘বর্বর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভায়োলেন্স প্রিভেনশন রিসার্চ প্রোগ্রামের পরিচালক গ্যারেন উইন্টেমিউট বলেন, ‘প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড আমাদের পরিচয়ের অংশ নয়। একটি দেশ হিসেবে আমরা এমন হতে চাই না।’

হোয়াইট হাউসের ভেতরেও কি বিভক্তি আছে

শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ভেতরেও এ নিয়ে মতভেদ দেখা গেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি জানি না এটি আদতে ঘটবে কি না।’ তিনি আরও বলেন, সরাসরি সম্প্রচার করা হলেও তিনি তা দেখবেন না।

কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিকল্পনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন, পেন্টাগন এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তিনি নিজে হাসান নিদালের মৃত্যুদণ্ড সম্প্রচার দেখবেন কি না, সে বিষয়ে কিছু জানাননি। তবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি তার জন্য মৃত্যুদণ্ডই সবচেয়ে উপযুক্ত শাস্তি।’

—বিবিসির প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম