আশঙ্কার চেয়ে দ্রুত গলছে থোয়াইটস হিমবাহ; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির শঙ্কা

অ্যান্টার্কটিকার দ্রুত গলতে থাকা থোয়াইটস হিমবাহ
অ্যান্টার্কটিকার দ্রুত গলতে থাকা থোয়াইটস হিমবাহ | ছবি: আনাদোলু
0

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যান্টার্কটিকার থোয়াইটস হিমবাহ বিজ্ঞানীদের আগের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতিতে গলছে। এর প্রভাবে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আগের অনুমানের চেয়ে দ্বিগুণ বাড়তে পারে। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় বরাত দিয়ে আনাদোলুর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, উষ্ণ সমুদ্রের পানি হিমবাহটির তলদেশের কয়েক কিলোমিটার গভীরে প্রবেশ করে নিচ থেকে বরফ গলিয়ে দিচ্ছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন করে বৈশ্বিক তাপমাত্রা না বাড়লেও বর্তমান পরিস্থিতিতেই ২১০০ সালের মধ্যে এই হিমবাহটি গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৩০ মিলিমিটার (১ দশমিক ২ ইঞ্চি) পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। আগের প্রচলিত বরফস্তর মডেলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন, ২১০০ সাল নাগাদ থোয়াইটস হিমবাহের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে প্রায় ১৫ মিলিমিটার।

ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কায় থোয়াইটসকে ‘ডুমসডে হিমবাহ’ বা কিয়ামতের হিমবাহ নামেও ডাকা হয়। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত এই হিমবাহটির আয়তন প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার বর্গকিলোমিটার (৭৪ হাজার বর্গমাইল), যা আয়তনে আফ্রিকার দেশ সেনেগালের সমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের চেয়েও বড়। এটি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তরের অংশ এবং পাইন আইল্যান্ড হিমবাহের সঙ্গে মিলে অভ্যন্তরীণ বিপুল পরিমাণ বরফ সাগরে ভেসে যাওয়া আটকে রাখার ঢাল হিসেবে কাজ করে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের মোট উচ্চতা বৃদ্ধির প্রায় চার শতাংশের জন্য এই থোয়াইটস হিমবাহ দায়ী। ২০০০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত হিমবাহটি এক লাখ কোটি টনেরও বেশি বরফ হারিয়েছে এবং প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টন বরফ হারিয়ে চলেছে। আশির দশকে হিমবাহটি দ্রুত সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি নজরে আসার পর থেকেই বিজ্ঞানীরা এটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে সাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বরফের নিচে উষ্ণ পানি প্রবেশ করছে, যা হিমবাহটি গলনের প্রধান কারণ।

গবেষণায় হিমবাহটির গ্রাউন্ডিং জোনের ওপর বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। এটি এমন একটি অঞ্চল, যেখানে তলদেশের শিলার ওপর থাকা বরফ সাগরের পানিতে ভাসতে শুরু করে। আগের গবেষণায় এই সীমানাকে স্থির ধরা হলেও নতুন মডেলে দেখা গেছে, জোয়ার-ভাটার কারণে বরফস্তর ওঠানামা করায় উষ্ণ পানি কয়েক কিলোমিটার গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) বিজ্ঞানী মাত্তিয়া পোয়িনেল্লি বলেন, জোয়ারের এই টান বা ‘টাইডাল পাম্পিং’-এর কারণে উষ্ণ পানি বরফের গভীর তলদেশে পৌঁছাতে পারছে এবং দ্রুত বরফ গলিয়ে দিচ্ছে।

নতুন এই গবেষণায় আরও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, হিমবাহটির গতি ধরে রাখা সমুদ্রতলদেশের মুজিনো শৈলশিরা থেকে থোয়াইটস বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ২১০০ সালের মধ্যে এই শৈলশিরা থেকে হিমবাহটির বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৬০ শতাংশ, যা এমনকি ২০৩০-এর দশকের শেষের দিকেও ঘটতে পারে। গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এমনটি ঘটলে হিমবাহটির গলন আরও ত্বরান্বিত হবে এবং বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো মারাত্মক বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

এএম