দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের চংচিং শহরের ২৮ বছর বয়সী তরুণী লিওন লু গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডনোটে ঝড় ও বন্যার ভিডিও দেখে আগ্রহী হন। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে কখনো টাইফুনের মুখোমুখি হইনি। শুধু খবরেই এর ভয়াবহতা দেখেছি। তাই নিরাপদ পরিবেশে এটি কেমন অনুভূতি তৈরি করে তা জানতে এবং কিছু শিখতেই এখানে এসেছি।’ এই অভিজ্ঞতার জন্য তিনি চংচিং থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় শহর হাংঝুতে আসেন এবং ২০ জনের একটি দলের সঙ্গে টাইফুন ও বন্যার কৃত্রিম মহড়ায় অংশ নেন।
কয়েক শ টন পানির প্রবল স্রোত যখন তাকে ভাসিয়ে সুরক্ষা প্রাচীরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন কিছুক্ষণের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন লিওন। তিনি বলেন, ‘পানির ধাক্কা লাগার পর আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে এটি কৃত্রিম মহড়া। তবে এখান থেকে আমি শিখেছি কীভাবে বন্যার সময় শান্ত থাকতে হয় এবং সঠিক শারীরিক ভঙ্গিতে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। কোনো বই বা স্কুল আমাকে এই শিক্ষা দিতে পারত না।’
হাংঝুতে অবস্থিত লুরসিং বেস নামের এই কেন্দ্রটি বর্তমানে অনলাইনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশ্বের চরম ও প্রতিকূল পরিবেশে প্রায় ১০ বছর ধরে তথ্যচিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত নির্মাতারা ২০২৪ সালে ২ লাখ বর্গমিটার আয়তনের এই কেন্দ্রটি গড়ে তোলেন। এখানে টাইফুন ও পাহাড়ি ঢলের মতো চরম আবহাওয়ার কৃত্রিম পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।
কেন্দ্রটির মহাব্যবস্থাপক ওয়াং কুয়াংহান জানান, রোমাঞ্চের খোঁজে অনেকে এখানে আসেন। তারা দেখতে চান আসল টাইফুন ও মুষলধারে বৃষ্টির ধাক্কা কেমন এবং তাদের শরীর তা সহ্য করতে পারে কি না। তাদের অধিকাংশ গ্রাহকের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। আগামী তিন বছরের মধ্যে চীনে এ ধরনের আরও পাঁচটি কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের কৃত্রিম অভিজ্ঞতাও যুক্ত করা হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে চরম আবহাওয়ার প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সব রেকর্ড ভেঙে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি বার্ষিক গড়ের চেয়ে বেশি, মোট ১০টি টাইফুন আঘাত হানে। দেশটির জরুরি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এসব দুর্যোগে ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হংকংয়ের চাইনিজ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্টের পরিচালক রবার্ট লি বলেন, চীনের নতুন প্রজন্মের পর্যটকেরা কেবল দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার বদলে বাস্তব অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে বেশি আগ্রহী।
কৃত্রিম অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কেউ কেউ বাস্তব দুর্যোগের ধ্বংসাবশেষ দেখতেও যাচ্ছেন। ২০০৮ সালের মে মাসে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে ৮ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। সিচুয়ানের ৩০ বছর বয়সী লেখিকা অ্যালিস দেশটির বেইচুয়ান শহরে সংরক্ষিত ধ্বংসাবশেষ দেখতে যান, যেখানে সরকার পুরোনো ভেঙে পড়া ভবনগুলোকে দর্শনার্থীদের জন্য ধাতব কাঠামো দিয়ে ধরে রেখেছে।
ভেঙে পড়া স্কুলভবন দেখে অ্যালিস বলেন, প্রকৃতির শক্তি এবং কত শিশু সেখান থেকে বাঁচতে পারেনি তা ভেবে আতঙ্ক লাগছিল। পুরো এলাকাটি একটি ভুতুড়ে রূপ নিয়েছে। তার মতে, এ ধরনের দুর্যোগ পর্যটন দেশকে তার অতীত ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে ও ইতিহাসকে মনে রাখতে সহায়তা করে।





