কামতা প্রসাদ নামের এক নাগরিক জন্মের পর থেকে দিল্লিতেই জীবনের ৫৩টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। এ সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষটি প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন নিজের অস্তিত্বের প্রমাণে। ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী থেকে বাদ পড়া ১৩ কোটি মানুষের একজন তিনি। গেলো আগস্টে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় তাকে মৃত গণ্য করা হয়েছে। এ কারণে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হন্যে হয়ে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরছেন তালিকায় নাম যুক্ত করতে।
কামতা প্রসাদ বলেন, ‘এসআইআরের সময় আমার নাম বাদ দেয়া হয়েছে। কোনো তদন্ত বা অনুসন্ধান ছাড়াই কমিশন আমাকে মৃত ঘোষণা করেছে। অথচ আমার কাছে পুরোনো ভোটার আইডি আছে এবং আমি নিয়মিত ভোট দিই। সামনের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় ফের নাম যুক্ত হবে কি না তা জানা নেই।’
ভোটার তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করতে নিজের দৈনন্দিন কর্মঘণ্টার একটি বড় সময় ব্যয় করছেন কামতা প্রসাদ। এসআইআর বিড়ম্বনায় পেশায় দর্জি এ মানুষটি প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন ২৫০ রুপি মজুরি থেকে।
শুধু কামতা প্রসাদই নয়, স্থানান্তরিত, দ্বৈত নাগরিকত্বসহ নানা অভিযোগে দিল্লিতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে ৪২ লাখ ভোটারকে। তাদেরই একজন ৩৮ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষক কমল লাল। অনেক বছর ধরে দিল্লির একটি কলোনীতে পরিবারসহ তিনি বসবাস করলেও স্থানান্তরিত ভোটার হিসেবে কমলের নাম বাদ দেয়া হয়েছে তালিকা থেকে।
আরও পড়ুন:
কমল লাল বলেন, ‘আমার আইডি কার্ড আছে। কিন্তু এটা যদি অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে এতদিন যে সরকারি সুবিধাগুলো পেয়ে এসেছি; তা থেকে বঞ্চিত হবো। এমনও হতে পারে সরকার আমাদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলবে।’
আর ভারতের বিরোধীদলগুলোর মতো এসআইআর প্রক্রিয়ায় কমিশনের স্বচ্ছতার অভাব আছে বলে অভিযোগ করছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো।
জন সারোকার স্বেচ্ছাসেবী রাজেন্দ্র কুমার বলেন, ‘কোনো স্বচ্ছতা নেই। যার যেমন ইচ্ছে সেভাবেই চালাচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া। যারা ২০২৫ সালে ভোট দিয়েছে তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণে কেন ২০০২ সালের ভোটার লিস্ট দেখা হচ্ছে। আর এসআইআর তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পেতে আমারই প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লেগেছিলো। তাহলে একজন অশিক্ষিত বা সন্তানহারা কোনো বৃদ্ধা কীভাবে এটা করতে পারবেন?’
এসআইআর কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের একটি স্ক্যাম বলে শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিল কংগ্রেসসহ বিরোধীদলগুলো। সবশেষ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। যেখানে দাবি করা হয় ভোটার তালিকা, নিবন্ধন পদ্ধতি ও নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে জ্ঞানেশের দুই সহকারী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। এরপর এক মাসেরও বেশি সময়সিইসি’র পদত্যাগ দাবিতে উত্তপ্ত ভারতের রাজপথ।
যদিও নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি নেতাদের দাবি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নকল, মৃত, স্থানান্তরিত এবং অন্য কোনোভাবে অযোগ্য ভোটারদের এসআইআরের মাধ্যমে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। আর ভুলবশত কোনো ভোটার বাদ পড়লে তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগে দাবি জানাতে আপিল করতে পারবেন।





