যুক্তরাজ্যের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কতটা গভীর?
দেশটির মোট সরকারি ঋণের বোঝা প্রথমবারের মতো ৩ ট্রিলিয়ন (৩ লাখ কোটি) পাউন্ডের সীমা ছাড়িয়েছে। কেবল এই বিপুল ঋণের সুদ গুনতেই প্রতিবছর সরকারের কোষাগার থেকে খরচ হচ্ছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন পাউন্ড। গত এক মাসেই সরকারের নতুন ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন পাউন্ড। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ব্রিটিশ সরকারের ঋণ ও সামগ্রিক ব্যয় প্রত্যাশার চেয়েও বেড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা কেন?
ইউরোপের নিরাপত্তা জোরদার এবং যুদ্ধের সার্বিক প্রস্তুতি বাড়াতে চলতি বছরের জুন মাসে ২৯৮ বিলিয়ন পাউন্ডের একটি রূপরেখা ঘোষণা করেছিল যুক্তরাজ্য সরকার। সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে সরকারের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির পুরো অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশ ২০৩০ সালের মধ্যে এবং সাড়ে ৩ শতাংশ ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষায় ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা বর্তমানে ২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে আগের নেতৃত্বের রেখে যাওয়া বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ডের ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি মেটাতে অন্যান্য বেসামরিক দপ্তরের বরাদ্দ কিছুটা কমিয়ে প্রতিরক্ষায় সমন্বয় করার ইঙ্গিত দিয়েছেন হিলি।
বড় ব্যাংক ও অনলাইন বিক্রেতাদের ওপর কি কর বাড়ছে?
আর্থিক ঘাটতি মেটাতে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিদেশি অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর করের চাপ বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই যুক্তরাজ্যের শীর্ষ চারটি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা করেছে। তাদের অতিরিক্ত আয়ের ওপর বাড়তি শুল্ক বসিয়ে অন্তত ২ বিলিয়ন পাউন্ড রাজস্ব আদায়ের পথ খুঁজছে রাজস্ব বিভাগ। এছাড়া আমাজন, তেমু বা ইবের মতো প্ল্যাটফর্মে যেসব বিদেশি বিক্রেতা যুক্তরাজ্যে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে পণ্য বিক্রি করেন, তাদের কঠোর আইনের আওতায় এনে প্রায় ১ বিলিয়ন পাউন্ড রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে শহরের অভ্যন্তরীণ সাধারণ খুচরা দোকানগুলোর ওপর থেকে বাণিজ্যিক করের চাপ কমানো হতে পারে।
জনকল্যাণ ও সামাজিক খাতে কী ধরনের সুবিধা মিলবে?
দৈনন্দিন সরকারি ব্যয় ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে এ বছর প্রায় ১ দশমিক ৪২ ট্রিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দের সম্ভাবনা রয়েছে। ঢালাও কর পরিবর্তনের পথে না হেঁটে নির্দিষ্ট কিছু খাতে প্রত্যক্ষ সহায়তার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে অসুস্থ ও প্রবীণদের সেবায় নিয়োজিত স্বজনদের ভাতার ওপর থাকা কঠোর আইনি সীমা তুলে নেয়া এবং মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি চলাকালীন আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়াও চকোলেট ও বিনসের মতো কিছু খাদ্যপণ্যের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে। পেনশনভোগীদের করমুক্ত আয়ের আওতায় রেখে সুরক্ষা দেয়া এবং ইংল্যান্ডের আবাসন সংকট নিরসনে সামাজিক আবাসন তহবিলে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন পাউন্ড যুক্ত করার প্রস্তুতি রয়েছে। প্রবীণদের জন্য একটি জাতীয় পরিচর্যা সেবা চালুর লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে বার্নহামের প্রশাসন।
জ্বালানি বিলের চাপ কমাতে কী পদক্ষেপ আসছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে আগামী জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে সাধারণ পরিবারগুলোর বার্ষিক বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল গড়ে প্রায় ২ হাজার পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস মিলেছে। গ্রাহকদের ওপর থেকে এই মারাত্মক বোঝা কমাতে সরকার জ্বালানি সরবরাহের ওপর আরোপিত নির্দিষ্ট মাশুল প্রত্যাহার করাসহ সরাসরি বিলের চাপ কমানোর বেশ কিছু সহায়তামূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দিতে পারে।
—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে





