রাজধানীর ফুটপাত হকারদের দখলে—সিন্ডিকেটে হুমকিতে বৈধ ব্যবসা

ফুটপাতে হকার
ফুটপাতে হকার | ছবি: এখন টিভি
0

রাজধানীর ব্যস্ত ফুটপাতগুলো এখন পথচারীদের বদলে হকারদের দখলে, যা রাজধানীর বৈধ অর্থনীতিকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশ দোকান-মালিক সমিতির তথ্য মতে, এরই মধ্যে দেশের বহু দোকানপাট বন্ধ হয়ে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ৬ লাখ কর্মী। হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসন ও নেপথ্যের শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট নির্মূলের দাবি নগর পরিকল্পনাবিদদের। অন্যদিকে, সিটি করপোরেশন বলছে, জনভোগান্তি ও যানজট মুক্ত শহর গড়তে কোনোভাবেই ফুটপাত দখল করতে দেয়া হবে না।

রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ব্যস্ত এলাকার চিরচেনা দৃশ্য দেখলে মনে হয় ফুটপাত মানেই যেন এক বিশাল প্রকাশ্য বাজার।

হকার্স ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় ৩ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জড়িয়ে আছেন এই ভাসমান বাণিজ্যে। মার্কেটগুলোর চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে পণ্য মেলায়, নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন এখানে।

সরকারি নিময় মেনে যারা বৈধ বিনিয়োগে ব্যবসা করছেন, তারা আজ খাদের কিনারায়। অথচ ফুটপাত দখল করে নামমাত্র খরচে দেদারসে মুনাফা লুটছে অবৈধ সিন্ডিকেট। এই অসম ও বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এখন রাজধানীর বৈধ অর্থনীতিকে বড় ধরণের হুমকির মুখে ফেলছে৷

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দাবি, শখে নয় বরং পেটের তাগিদে স্থায়ী জায়গা না পেয়েই ফুটপাতে বসছেন।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলেন, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য বাধ্য হয়েই তারা এখানে আসছেন। তাদের যে উচ্ছেদ করে দিচ্ছে, তার বিপরীতে একটু জায়গা নির্ধারণ করে দেয়ার দাবি জানান তারা।

ফুটপাতের এই জমজমাট বাণিজ্যের ঠিক বিপরীত চিত্র পাশের বহুতল মার্কেটগুলোতে। দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের গুণতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা।

মার্কেট ব্যবসায়ীরা জানান, এখন অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ। এজন্য কম দামের জন্য ফুটপাতে কাস্টমার বেশি পাওয়া যায়।

দোকান-মালিক সমিতির মহাসচিব জানান, ফুটপাত দখলমুক্ত করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংকট দূর করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ দোকান-মালিক সমিতির মহাসচিব জহিরুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘হকারদেরকে কেউ না কেউ ব্যাকং দেয়। যার কারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও সেটা বাস্তবায়িত হয়নি আজ পর্যন্ত। এতে করে মার্কেটের দোকানদারেরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দোকানপাট ছেড়ে দিয়ে এরই মধ্যে ৬ লাখ কর্মচারী ছাঁটাই হয়েছে।’

সংকট সমাধানে শুধু হকার তাড়িয়ে নয় বরং স্থায়ী পুনর্বাসন ব্যবস্থা ও ফুটপাতের নেপথ্যের শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট নিরসন করতে হবে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

আরও পড়ুন: সড়ক-ফুটপাতে হকার বসলেই মালামাল ক্রোক ও মামলা: ডিএসসিসি প্রশাসক

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘অবৈধ কোনো কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি নগর চুম্বক বা ম্যাগনেট হতে পারে না। এবং সেই ম্যাগনেট হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই নগরী সারা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যারা বেকার, তাদের আকর্ষণ করে নগরীর সকল সুবিধাকে ভারাক্রান্ত করতে পারে না।’

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিলুর রহমান বলেন, ‘বৈধভাবে ব্যবসা করার জন্য মানুষের আগ্রহ হারাচ্ছে। আর যারা ন্যূনতম সুযোগ পাচ্ছে সে ঢাকার ফুটপাতে এসে বসে যাচ্ছে। এখন এই রাস্তাটাকে নির্মিত না করতে পারলে বাংলাদেশের যে ইকোনমিক যে ব্যালেন্স, সেটা নষ্ট হয়ে যাবে।’

এদিকে, সিটি করপোরেশন বলছে, জনভোগান্তি ও যানজট মুক্ত শহর গড়তে কোনভাবেই ফুটপাত দখল করতে দেয়া হবে না। অরাজকতা করলে নেয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা ।

ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘যখন হকাররা অন্যত কোথাও বসবে যেখানে যানজটের সৃষ্টি হবে না, ২০০ দোকানই যদি এক জায়গায় বসে, আল্টিমেটলি কিন্তু সেই কাস্টমারগুলো জানবে যে তারা কোথায় বসছে। তো এই বিষয়গুলো তাদের কাছে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি। তারা যদি বোঝার জন্য চেষ্টা করে বা আমাদের সহযোগিতা করে, চায়—আমরা তো অবশ্যই করব। কিন্তু তারা সহযোগিতার নামে যদি আবার অরাজকতা কিংবা ওই জায়গাকে আবার বেছে নেওয়ার চেষ্টা করে, সেটাকে তো করতে দেওয়া হবে না।’

ডিএসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘রাস্তা ছাড়া আরো কিছু জায়গায় আমরা ফুটপাতে কিছু জায়গা দিয়েছি যে জায়গায় ফুটপাত বড় আছে। এবং এইটা হলো তাদের সঙ্গে আলোচনার সাপেক্ষে আমরা এটা করেছি। কিন্তু তাদের সঙ্গে একটা শর্ত হলো এটা পরিষ্কার। যে কোনোভাবেই মূল রাস্তায় আমরা হকারদেরকে বসতে দেবো না। এবং এ ব্যাপারে তারাও একমত।’

রাজধানীর শৃঙ্খলার স্বার্থে ফুটপাত পথচারীদের ফিরিয়ে দেয়া যেমন জরুরি, তেমনই নিয়মতান্ত্রিক ব্যবসার পরিবেশ টিকিয়ে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উচ্ছেদ আর পুনর্দখলের এই চক্র ভেঙে, প্রশাসন কি পারবে সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে একটি সুশৃঙ্খল নগর বাণিজ্য গড়ে তুলতে?

এফএস