বিশ্বকাপে রেকর্ড ১৩ গোল করেও কেন গোল্ডেন বুট পাননি জাঁ ফন্টেইন?

জাঁ ফন্টেইন
জাঁ ফন্টেইন | ছবি: সংগৃহীত
0

বিশ্বকাপে কে কার থেকে বেশি গোল করে এগিয়ে যাবেন? যার নামের পাশে সংখ্যাটা থাকবে সবচেয়ে বেশি, আসর শেষে তার হাতেই উঠবে গোল্ডেন বুট পুরস্কার। আসর শুরু হলেই শিরোপার জয়ের সঙ্গে চলে এ প্রতিযোগিতাও। থমাস মুলার, হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে কখনও ৫ গোল কখনও ৬ থেকে ৮ গোল করেই গোল্ডেন বুট খেতাব জয়ের রেকর্ড রয়েছে তাদের। তবে বিশ্বকাপে ১৩ গোল করেও জেতা হয়নি স্বর্ণে মোড়ানো এ বুট। তবে কেন?

একটি বিশ্বকাপে ১৩ গোল। সেটাও আবার মাত্র ৬ ম্যাচ খেলেই। ভাবা যায়? এখনকার আধুনিক ফুটবলে লিওনেল মেসি, এমবাপ্পেরা যা করতে পারেননি সেটাই হয়েছে ৬৮ বছর আগে। ফ্রান্সের জার্সি গায়ে জাঁফন্তে সে অনন্য রেকর্ডটি গড়েন ১৯৫৮ সালে। এরপরও জেতা হয়নি গোল্ডেন বুট। মজার বিষয় হলো সেই আসরে তিনি নিজের বুট নয় বরং ধার করা বুটে মাঠ মাতিয়ে গড়েন এ অসাধারণ কীর্তি।

ক্রীড়া সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ ফিলিপ বার্কার বিবিসি স্পোর্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে নাকি ইতিহাস গড়া এ ফুটবলারের থাকারই কথা ছিলনা

বার্কার বলেন, ‘ফন্টেইন আসলে প্রথম পছন্দের স্ট্রাইকার ছিলেন না। তার সতীর্থ রেনে ব্লিয়ার্ড প্রস্তুতি ম্যাচে চোট পাওয়ার পর শেষ মুহূর্তে তাকে দলে নেয়া হয়। এটাই হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিলো। তবে প্রথম ম্যাচে খেলতে তাকে সতীর্থ স্টেফান ব্রুয়ের কাছ থেকে বুট ধার করতে হয়েছিল, কারণ তার নিজের মাপের বুট ছিলো না।’

অনেকের মনে এখন প্রশ্ন উঠতে পারে হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পেরা মাত্র ৬ বা ৮ গোল করেই যেখানে গোল্ডেন বুট জিতেছেন, জাফন্তের বেলায় ভিন্নতা কেন?

আরও পড়ুন

মূলত ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া ফুটবলের বিশ্ব আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের এ পুরস্কার ফিফা চালু করে ১৯৮২ সাল থেকে। যে কারণে এখন পর্যন্ত জাফন্তের সর্বোচ্চ গোলদাতার সে রেকর্ড অক্ষত থাকলেও সে সময় নিজের নামে কোনো গোল্ডেন বুট পাননি এ ফুটবলার।

অবশ্য ১৯৫৮ সালে সুইডেনের একটি সংবাদপত্র তাকে দুর্দান্ত গোল করার স্বীকৃতি হিসেবে একটি এয়ার রাইফেল উপহার দেয় এবং তাকে আখ্যা দেয় ‘শার্প শ্যুটার হিসেবে। তবে দেরিতে হলেও ২০১৪ সালে তার অনন্য কীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে ফিফা বিশেষ একটি প্লাটিনাম বুট উপহার দেয় জাফন্তেকে।

এরপর আর কোনো পুরুষ ফুটবলারই এক বিশ্বকাপে ১৩ গোল করতে পারেননি। ১৯৭০ সালে জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলার ১০ গোল করেন। এ পর্যন্তই এরপর আর এত বেশি গোল করার রেকর্ড নেই কারও। তবে এবারের আসরে সেই রেকর্ড ভাঙার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ হওয়ায় ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে। সেক্ষেত্রে সেমিফাইনালে ওঠা দলগুলোকে খেলতে হচ্ছে মোট ৮টি ম্যাচ। যে সুবিধা নিয়ে এরই মধ্যেই মেসি ও এমবাপ্পের গোল সংখ্যা ৮, আর হ্যারি কেন ও জুড বেলিংহামের রয়েছে ৬টি করে গোল।

তবে স্বাভাবিকভাবে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে বিশেষ এ কীর্তি গড়ার পরও ফন্টেইনের নাম কেন সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় খুব বেশি দেখা যায় না?

আরও পড়ুন

এর প্রধান কারণ ছিলো চোট। ১৯৬০ সালের মার্চে ফরাসি লিগের এক ম্যাচে তার পা ভেঙে যায়। এরপর বারবার ফিরে আসার চেষ্টা করলেও চোট আরও জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে তাকে অবসর নিতে হয়। আর ফ্রান্সের হয়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয় মাত্র ২১টি ম্যাচে ৩০ গোল করে।

অবসরের পরও ফুটবলের সঙ্গেই ছিলেন জাফন্তে। ১৯৬১ সালে তিনি ফরাসি ফুটবলারদের সংগঠন (ইউনিয়ন ন্যাশনাল ডেস ফুটবলার প্রফেশনালস) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং প্রথম সভাপতি হন। পরে তিনি কোচিংও করেন। ১৯৬৭ সালে দুই ম্যাচে ফ্রান্স জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া পিএসজি, তুলুজ এবং জন্মভূমি মরক্কোর জাতীয় দলেরও কোচিং করিয়েছেন।

২০২৩ সালের ১ মার্চ ৮৯ বছর বয়সে মারা যান জাফন্তে। জীবদ্দশায় তিনি ফ্রান্সকে দুইবার বিশ্বকাপ জিততে দেখেছেন। সে সঙ্গে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো আগ্রাসী ফুটবলারের উত্থানও দেখেছেন নিজ চোখে। যার নামের পাশে এত বড় অর্জন, যার কীর্তি নিয়ে আজও চর্চা হয় বিশ্ব ফুটবলারদের আড্ডায়। সে ফুটবলারই দিনশেষে বিশ্বফুটবলে এক অবমূল্যায়িত।

জেআর