এক দশকেও অগ্রগতি নেই জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে; বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা

জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি শিল্প-প্রতিষ্ঠান
জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি শিল্প-প্রতিষ্ঠান | ছবি: এখন টিভি
0

চট্টগ্রামে ৩৩ হাজার একর জায়গায় ১৫ লাখ কর্মসংস্থানের স্বপ্ন নিয়ে দশক আগে শুরু হয় দেশের সর্ববৃহৎ ইকনোমিক জোন। কিন্তু পানি, বিদ্যুৎ আর গ্যাসের অভাবে থমকে আছে বড় বিনিয়োগ। দক্ষ শ্রমিকের অভাব, যাতায়াত ও আবাসন অসুবিধা, ব্যাংক ও সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের অভাব ভাবিয়ে তুলছে উদ্যোক্তাদের। বিজিএমইএ বলছে, এখনও ৫০০ একর জায়গায় প্লট বুঝে না পাওয়ায় বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা।

চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সাগর উপকূলে প্রায় ৩৩ হাজার একর জায়গায় ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের। এক দশকে দেশের সর্ববৃহৎ এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে শিল্প কারখানা। অবকাঠামো নির্মাণের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে চারপাশে।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে ১০ বছরে ভারত, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন বিদেশি ও দেশি মিলে মোট ১৭টি কারখানা চালু হয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ২০ হাজার শ্রমিকের। নির্মাণাধীন আছে আরও প্রায় ২৪টি কারখানা। ২০৩০ সালের মধ্যে এখানে বিনিয়োগ হতে পারে ১৯ বিলিয়ন ডলার।

জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের কনসালটেন্ট আবদুর কাদের খান বলেন, ‘দিনে দিনে এখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ফরেন যে বিনিয়োগ আমরা দেখি। দেখেছি যে শিল্পগুলো নির্মাণ হয়েছে তার অধিকাংশ চাইনিজ। এছাড়াও বাংলাদেশের কিছু বড় গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ রয়েছে, তারাও শিল্প উৎপাদনে এসেছে।’

আরও পড়ুন:

তবে প্রত্যাশার তুলনায় অগ্রগতি কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, পানি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বড় বিনিয়োগ নিয়ে ভাবছেন তারা। এছাড়া ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও বিভিন্ন লাইসেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষের অফিস নেই। আশেপাশে গড়ে ওঠেনি শ্রমিকদের আবাসন সুবিধাও।

মর্ডান টেক্সটাইলের জিএম সফল বড়ুয়া বলেন, ‘যেখানে একটা বড় ইনভেস্টমেন্ট দরকার, যেখানে কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর আছে; যেমন—আনইন্টারাপ্টেড পাওয়ার সাপ্লাই পাওয়া, আনইন্টারাপ্টেড আদার ইউটিলিটি সাপ্লাই পাওয়া—লাইক ওয়াটার, গ্যাস- এগুলো। এগুলো যদি না থাকে, এ ধরনের প্রজেক্ট আসলে প্রফিটেবলি চালানো খুবই ডিফিকাল্ট।’

এর সঙ্গে রয়েছে দক্ষ শ্রমিক সংকট। কারখানাগুলোতে যে মানের শ্রমিক প্রয়োজন, সে শ্রমিক নেই। যাতায়াত অসুবিধা ও বিভিন্ন সুবিধার অভাবে বাইরে থেকেও আসছে না শ্রমিক।

বিশাল এ ইকোনমিক জোনে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা হাজার হাজার ডলার বিনিয়োগ করছেন, গড়ে তুলছেন বড় বড় এসব কারখানা। কিন্তু এ ধরনের প্রতিটি কারখানাই এখানে দক্ষ শ্রমিক সংকটে ভুগছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, স্থানীয় জনশক্তির যেমন অভাব নেই, দেশে বেকারের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু এই বিশেষায়িত কারখানাগুলোতে যে ধরনের শ্রমিকের প্রয়োজন, সে ধরনের শ্রমিক তৈরিতে কোনো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এগিয়ে না আসায় তারা শ্রমিক সংকটে ভুগছেন।

আরও পড়ুন:

ইকোনমিক জোনের চারপাশ এখনো ঘন বন। সন্ধ্যা নামলেই নীরব-নিস্তব্ধ। পণ্য চুরির ঘটনাও ঘটছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঘাটতি একটি বড় বাধা।

এসকিউ ক্যাবলসের এইচ.আর এহসানুল কবির বলেন, ‘যেহেতু এটা হাইওয়ে থেকে অনেক দূরে, প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটারের ভেতরে, সমুদ্রের পাশে— তো একটু নীরব অঞ্চল, রাত্রে অন্ধকার হয়ে যায়। ভাল আলো-লাইটিং ব্যবস্থা করতে হবে, নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। তাইলে ধীরে ধীরে মানুষজনের আগ্রহ, কাজ করার আগ্রহ বাড়বে।’

এদিকে পোশাক খাতের জন্য বরাদ্দ ৫০০ একর জমি এখনো বুঝিয়ে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ বিজিএমইএ’র। এছাড়া শুরুর দিকের ভ্যাট-ট্যাক্স সুবিধা কমানোর কারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন শিল্প মালিকরা।

বিজিএমইএ’র পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমার প্লটটা এখনো পর্যন্ত ডিমারকেশন করে আমাকে অ্যালটমেন্টটা দেয়া হচ্ছে না। তো যতক্ষণ না পর্যন্ত এগুলো এনসিওর করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত উদ্যোক্তারা কোনোভাবে ওইখানে রিস্কে যাচ্ছে না বলে আমরা মনে করছি।’

তবে শিল্পায়নের প্রভাবে প্রত্যন্ত এ সমুদ্র উপকূল এলাকায় বদলেছে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা। দোকানপাট, মার্কেট, ঠিকাদারি ব্যবসায় আয় করছেন অনেকে। কয়েক হাজার নারীও কাজ পেয়েছেন বিভিন্ন কারখানায়।

এসএস