নিপাহ ভাইরাস আতঙ্ক: ৩৫ জেলায় বিস্তার ও সংক্রমণের ধরনে ভয়ংকর পরিবর্তন

নিপাহ ভাইরাস আতঙ্ক
নিপাহ ভাইরাস আতঙ্ক | ছবি: এখন টিভি
1

শীত আসতেই দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস (Nipah Virus); যেখানে আক্রান্ত হলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। সম্প্রতি দেশের ৩৫টি জেলায় এই ভাইরাসের (Nipah Virus Outbreak 2026) উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণের ধরন (Transmission Pattern) উদ্বেগজনক হারে পরিবর্তিত হচ্ছে।

গতকাল (বুধবার, ৭ জানুয়ারি) আইইডিসিআর (IEDCR) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সভায় জানানো হয়, গত বছর (২০২৫) শনাক্ত হওয়া চারটি কেসের সবকটিতেই মৃত্যুহার ছিল ১০০ শতাংশ (100% Mortality Rate)।

একনজরে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ ও করণীয়

  • প্রচণ্ড জ্বর ও মাথাব্যথা: দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।
  • মানসিক বিভ্রান্তি বা প্রলাপ বকা: রোগীকে আইসোলেশনে (বিচ্ছিন্ন রাখা) রাখুন।
  • শ্বাসকষ্ট বা কাশির সমস্যা: রোগীকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও বিশ্রাম দিন।
  • খিঁচুনি বা অচেতন হওয়া: আইইডিসিআর (IEDCR) হটলাইনে কল করুন।

প্রথমবারের মতো ‘অ-মৌসুমি’ নিপাহ কেস (Non-seasonal Nipah Case)

আইইডিসিআরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানান, সাধারণত শীতকালে খেজুরের রসের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ালেও গত আগস্টে নওগাঁয় একটি অ-মৌসুমি কেস (Non-seasonal Case) শনাক্ত হয়েছে। ৮ বছরের এক শিশু বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল (কালোজাম, আম) খেয়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এটি একটি বড় সতর্ক সংকেত (Warning Signal), কারণ এর অর্থ হলো নিপাহ এখন শুধু শীতকাল বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

নিপাহ ভাইরাসের জন্য 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' বা 'সংক্রমিত এলাকা'

আইইডিসিআর (IEDCR) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে বর্তমানে ৩৫টি জেলাকে নিপাহ ভাইরাসের জন্য 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' বা 'সংক্রমিত এলাকা' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলেই এই ভাইরাসের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।

নিচে সংক্রমণের তীব্রতা অনুযায়ী জেলাগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:

১. সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলা (হাই-রিস্ক জোন)

এই জেলাগুলোতে প্রায় প্রতি বছরই নিপাহ রোগী শনাক্ত হয় এবং মৃত্যুর হার অনেক বেশি:

  • ফরিদপুর (সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের রেকর্ড এখানে)
  • রাজবাড়ী
  • নওগাঁ
  • লালমনিরহাট
  • নাটোর
  • কুষ্টিয়া
  • পাবনা

২. উত্তরবঙ্গের জেলাসমূহ

উত্তরবঙ্গের একটি বড় অংশ এখন নিপাহ ভাইরাসের হটস্পট: রাজশাহী, নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়া, রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম এবং ঠাকুরগাঁও।

৩. দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহ

দেশের এই অঞ্চলে খেজুরের রসের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে সংক্রমণ বেশি হয়: যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর এবং শরীয়তপুর।

৪. অন্যান্য আক্রান্ত জেলা (২০২৫-২৬ এর আপডেটসহ)

সম্প্রতি দেশের অন্যান্য প্রান্তেও এই ভাইরাসের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে: ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ভোলা (উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন শনাক্ত), টাঙ্গাইল এবং নড়াইল।

আরও পড়ুন:

সংক্রমণের মাধ্যম ও নতুন ঝুঁকি (Transmission Sources and Risks)

নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ফলখেকো বাদুড় (Pteropus Bats)। এদের লালা বা প্রস্রাবের মাধ্যমে খেজুরের কাঁচা রস দূষিত হয়। এছাড়া নতুন গবেষণায় দেখা গেছে:

বুকের দুধের মাধ্যমে সংক্রমণ: প্রথমবারের মতো আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধেও (Breast Milk) এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ: প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সরাসরি অন্য সুস্থ ব্যক্তিতে (Human-to-Human Transmission) এই ভাইরাস ছড়ায়।

আধা-খাওয়া ফল: গাছের নিচে পড়ে থাকা বা বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল সরাসরি খাওয়া এখন বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন:

নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ ও প্রতিকার (Nipah Virus Symptoms and Prevention)

নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৫-৭ দিনের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, গলাব্যথা (Fever, Headache, Sore Throat), বমি, ঝিমুনি এবং অচেতনতার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এই ভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন (Nipah Vaccine) বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন প্রতিরোধে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:

১. খেজুরের কাঁচা রস (Raw Date Juice) পান করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে।

২. মশারিতে ঢাকা রসের হাঁড়িও নিরাপদ নয়। বিকল্প হিসেবে গুড় ব্যবহার করা যেতে পারে।

৩. কোনো প্রকার আধা-খাওয়া বা ফাটা ফল (Half-eaten Fruits) খাওয়া যাবে না। ৪. ফলমূল খাওয়ার আগে খুব ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।

আরও পড়ুন:

নিপাহ ভাইরাসের (Nipah Virus) কোনো নির্দিষ্ট ঔষধ বা ভ্যাকসিন না থাকায়প্রতিরোধই হচ্ছে একমাত্র চিকিৎসা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ঝুঁকি এড়াতে বিস্তারিত ডায়েট গাইডলাইন ও সচেতনতামূলক তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

১. নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে বিশেষ ডায়েট গাইডলাইন (Dietary Guidelines)

নিপাহ থেকে বাঁচতে খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে নিচের নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে:

কাঁচা রস সম্পূর্ণ বর্জন: শীতকালে খেজুরের কাঁচা রস (Raw Date Juice) খাওয়ার অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করুন। রস ফুটিয়ে খেলে ঝুঁকি কমে, তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এটি এড়িয়ে চলারই পরামর্শ দেন।

ফল ধোয়া ও পরিষ্কার করা: বাজার থেকে কেনা ফলমূল (বিশেষ করে পেয়ারা, বরই, টমেটো, আপেল) খাওয়ার আগে লবণমিশ্রিত কুসুম গরম পানিতে কমপক্ষে ১০-১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন এবং তারপর পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।

আধা-খাওয়া ফল বর্জন: গাছ থেকে পড়া বা বাদুড়/পাখির আধা-খাওয়া (Half-eaten Fruits) কোনো ফল ভুলেও স্পর্শ করবেন না বা খাবেন না।

ফল ছিলে খাওয়া: সম্ভব হলে যেসব ফলের খোসা ছাড়ানো যায় (যেমন- কলা, কমলা, মাল্টা), সেগুলো ছিলে খান।

ফোটানো পানি পান: পানিবাহিত অন্যান্য রোগের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সর্বদা নিরাপদ ও ফোটানো পানি পান করুন।

খেজুরের গুড়: কাঁচা রসের বদলে ভালোভাবে জ্বাল দেওয়া খেজুরের গুড় (Date Jaggery) খাওয়া নিরাপদ।

আরও পড়ুন:

২. সচেতনতামূলক জরুরি তথ্য (Safety Measures)

নিপাহ ভাইরাস শুধু খাবার নয়, সংস্পর্শের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। তাই নিচের বিষয়গুলোতে লক্ষ্য রাখুন:

সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা: নিপাহ আক্রান্ত রোগীর সেবা করার সময় অবশ্যই এন-৯৫ (N-95) মাস্ক এবং গ্লাভস ব্যবহার করুন। রোগীর ব্যবহৃত থালা-বাসন বা কাপড় আলাদাভাবে পরিষ্কার করুন।

হাত ধোয়ার অভ্যাস: বাইরে থেকে ফেরার পর বা কোনো কিছু খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।

পোষা প্রাণীর সুরক্ষা: অনেক সময় পোষা প্রাণী (যেমন- শুকর বা গবাদিপশু) বাদুড়ের সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হতে পারে। তাদের খাবার ও আশ্রয়ের ক্ষেত্রেও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।

তাড়ি ও নেশাজাতীয় পানীয়: কাঁচা রস থেকে তৈরি নেশাজাতীয় পানীয় ‘তাড়ি’ পান করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতেও ভাইরাসের উপস্থিতি থাকতে পারে।

আইইডিসিআর (IEDCR) হটলাইন নম্বর

যেকোনো প্রয়োজনে বা সন্দেহভাজন নিপাহ রোগী শনাক্ত হলে কল করুন: ০১৯৩৭-১১০০১১, ০১৯৩৭-০০০০১১।

আরও পড়ুন:


এসআর