পরিবারের সঙ্গে ঈদ উপভোগ করতে রডবাহী ট্রাকযোগে ২৬ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আজ (সোমবার, ২৫ মে) বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে রডবাহী ট্রাকটি নিয়ন্ত্রন হারিয়ে সড়কে উল্টে চাপা পড়ে মারা গেছেন বারিক। একইসঙে এই উপজেলার আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত আব্দুল বারিকের স্ত্রী মারুফা খাতুন বলেন, ‘গতকাল (রোববার, ২৪ মে) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তখন বাবার বাড়িতে ছিলাম। স্বামীর সাথে কথা ছিলো ব্যবসা থেকে ফিরে একসঙ্গে স্বামীর বাড়ি যাবো। কিন্তু তার সাথে আমার আর স্বামীর বাড়ি যাওয়া হলো না৷’
দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ নিজের স্বামীর বাড়িতে আসতে হলো বলে আহাজারি করে বারবার মুর্ছা যান এই নারী। স্বজনরা তাকে স্বান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু এই বাধ কী সহজে মানার!
ছেলের শোকে মা ময়না বেগমও পাগলপ্রায় অবস্থা। কান্না আর বিলাপ করছেন তিনি। ছেলে শোকে পাগলপ্রায় অবস্থা কথাও বলতে পারছেন না। স্বজনরা তাকে পাখার বাতাস করে স্বান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন।
একই অবস্থা মান্দা উপজেলার পাকুড়িয়া ও মজিদপুর গ্রামের। রাজেন্দ্রবাটি এক গ্রামেই অন্তত ৭ জন মারা যায়। দুর্ঘটনায় কারো বাবা, কারো, স্বামী ও সন্তান আবার কারো ভাই মারা গেছেন। স্বজনদের হারিয়ে কান্না করছেন। এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
বিকেল ৩টার দিকে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে আসেন মান্দা উপজেলার নির্বাহী অফিসার আখতার জাহান সাথী, ভারশোঁ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোাস্তাফিজুর রহমান সুমন এবং জেলা জামায়াতে আমির আব্দুল রাকীব। তারা নিহতের পরিবারে খোঁজখবর নেন ও তাদের প্রতি সমবেদনা জানান।
আরও পড়ুন:
উপজেলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুল বারিক (২২), তার চাচা আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা (৪০), সাকিম হোসেনের ছেলে সাগর হোসেন (২২), আকব্বর আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (২০), সুলতান মাহমুদের ছেলে তারেক রহমান (১৮), শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল আলম (২৮)
পাকুড়িয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে মাইনুল ইসলাম (২৮) ও তার ভাই গিয়াস উদ্দিন (২২)। হোসেনপুর গ্রামের জাফের আলীর ছেলে মাইনুল ইসলামসহ (৩৫) ১৩ জন।
স্থানীয় ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি, পাকুড়িয়া ও হোসেনপুর দরিদ্রপ্রবন গ্রাম। এসব গ্রামের মানুষ জীবিকার তাগিদে নোয়াখালী ও ফেনীর বিভিন্ন গ্রামে ফেরি করে হরেক ধরনের পণ্যের ব্যবসা করেন। এসব গ্রাম থেকে শতাধিক মানুষ ওই জেলায় গিয়ে কেউ অন্তত ১৫ দিন, ২০ দিন, ২৫ দিন বা ১ মাস ব্যবসা করেন। এরপর তারা কিছুটা ভালো রোজগার হলে গ্রামে ফিরে আসেন। কিছুদিন গ্রামে থেকে আবার ব্যবসার জন্য বাড়ি ছাড়েন।
দুর্ঘটনায় নিহত দলটি ২০-২৫ দিন নোয়াখালী গিয়েছিল। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে তারা ফিরছিলেন। কিছু টাকা বাঁচাতে ট্রাকযোগে এই ২৬ জন বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু পথেই হলো সেই যাত্রার সমাপ্তি। ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে রডবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রন হারিয়ে উল্টে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় ১৫ জনের এবং আহত হয়েছেন ১০ জন।
নিহত তারেক রহমানের মা মোমেনা বেগম বলেন, ‘রাত ৮টার দিকে ছেলের সঙ্গে কথা হয়। সে জানায় রাতেই তারা ট্রাকে করে রওয়ানা দেবে। কিন্তু ছেলে আর বাড়ি ফিরলো না। সকালে ফোনে জানতে পারলাম ছেলে ট্রাকের রড চাপা পড়ে মারা গেছে। এ শোক কীভাবে সইবো!’
মরদেহ দ্রুত বাড়ি ফেরানোর দাবির পাশাপাশি নিহত ও আহতদের সরকারিভাবে সহযোগিতার দাবী জানিয়েছে এলাকাবাসী।
মান্দা উপজেলার নির্বাহী অফিসার আখতার জাহান সাথী বলেন, ‘নিহতের স্বজনরা ঘটনাস্থলে রওয়ানা দিয়েছেন। যেহেতু অনেকের মুখমণ্ডল চিনতে একটু সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে মরদেহ বুঝে নিতে দেরি হচ্ছে। তবে দেরি হওয়ায় জানাযা সম্ভবত আজ হচ্ছে না।’
আর নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। নিহতদের বিষয়ে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের জানাযা সম্পন্নের জন্য প্রত্যেক নিহতেরর পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা সহযোগিতা করা হবে।’





