আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই: শব্দ দূষণের ফাঁদে ময়মনসিংহ শহর

ময়মনসিংহ শহরে যানজটের চিত্র
ময়মনসিংহ শহরে যানজটের চিত্র | ছবি: এখন টিভি
0

ময়মনসিংহে তীব্র যানজটের পাশাপাশি ভয়ঙ্কর শব্দ দূষণে অতিষ্ঠ নগরবাসী। ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যানবাহন চলায় সংকট আরও বাড়ছে। গবেষকরা বলছেন, শব্দ দূষণের সহনীয় মাত্রা ৬৫ থেকে ৭৫ ডেসিবলের চেয়ে কোথাও তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৬ ডেসিবল। এতে করে শ্রবণ শক্তি হারানোর পাশাপাশি স্নায়ু, হৃদরোগসহ নানান শারীরিক মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্কুল ছুটির পর চার দেয়ালের মাঝের ঝুল বারান্দাটাই দানিনের প্রশান্তির একমাত্র জায়গা। চুপচাপ গ্রিল ধরে দূর আকাশের দিকে আনমনে কী যেন ভাবে মেয়েটি। অবসরের রং তুলিতে কোন ফুল পাখি নেই, মনের ক্যানভাস জুড়ে কেবল যান্ত্রিক শহরের যাপিত জীবনের হাসঁফাসের গল্পটাই ফুটে ওঠে। মেয়ের এমন আকস্মিক পরিবর্তনে বেশ চিন্তিত কলেজ শিক্ষিকা মা।

দানিন বলেন, যখন স্কুলে যাই বা বাইরের কোনো কাজে যাই তখন আমার খুব বিরক্ত লাগে এই যানজটের জন্য।

অভিভাবকরা জানান, বাইরে প্রচণ্ড সাউন্ড, ওদের চোখ-মুখ দেখি কুঁচকানো থাকে, বিরক্তি একটা ভাব থাকে। এবং বাইরে থেকে বাসায় আসার পর কিছু বললেই দেখা যায় একটু খিটখিটে মেজাজ হয়ে যায়

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায় স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে জনসংখ্যা ১২ লাখেরও বেশি। প্রত্যাহিত জীবন ও জীবিকার প্রয়োজন যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। মানুষ বাড়ার সাথে সাথে যানবাহনের সংখ্যাও বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে শব্দ দূষণ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করছে। যার কারণে শ্রবণশক্তি হারানো থেকে স্নায়ুজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন শিশু, বয়োবৃদ্ধ- গর্ভবতী নারীরা।

পথচারীরা জানান, সারাদিন কাজ করার পর বাসায় গেলে মাথাব্যথা করে। ঘুমের সমস্যা হয়। সরকার এবং প্রশাসনের, সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে আবেদন যেন এই শব্দদূষণগুলা একটু কমানো যায়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুরাদ আহমেদ ফারুখ শহরের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যমান শব্দের মাত্রা পরিমাপ করেন। এতে শহরের কাঁচিঝুলি, নতুন বাজার, চরপাড়া, মাসকান্দা, পাটগুদাম এবং তাজমহল পয়েন্টে দৈনিক গড় শব্দের মাত্রা ছিল ৭৮ থেকে ১০৬ ডেসিবল পর্যন্ত।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুখ বলেন, এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমার কাছে মনে হয় সর্বাগ্রে যেটি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে যে সচেতনতা তৈরি করা মানুষের মধ্যে। আপনি হর্ন বাজাবেন কি বাজাবেন না সেটা কিন্তু সম্পূর্ণভাবে আপনার নীতি-নৈতিকতার উপর নির্ভর করছে। আপনি যখন দেখছেন যে ট্রাফিক জ্যামে আপনি আটকে পড়ে আছেন, আপনি যতই হর্ন দেন না কেন, আপনি কিন্তু সামনে এগোতে পারছেন না। বিধায় ওই জায়গাটাতে হর্ন দেয়াটার প্রয়োজন ছিলো না।

এদিকে শব্দ দূষণ রোধে গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কার্যক্রম চোখে না পড়লেও মাসিক বিভিন্ন সেশনে চালকদের যত্রতত্র হর্ন বাজাতে নিরুৎসাহিত করার দাবি করেন ময়মনসিংহ বিআরটিএ মোটরযান পরিদর্শক।

ময়মনসিংহ বিআরটিএ মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর বলেন, বিভিন্ন জায়গায় যে শব্দদূষণগুলো, মসজিদ, মাদ্রাসা—যেগুলো আপনার হাসপাতাল, বিভিন্ন ধরনের স্কুল-কলেজের সামনে যেগুলো আমরা হাইড্রোলিক হর্ন যেন ব্যবহার না করা হয়, সেইগুলোকে আপনাদেরকে, তাদেরকে ড্রাইবারদেরকে আমরা অ্যাওয়ারনেস করে থাকি।

সরকার শব্দ দূষণ রোধে ২০০৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। আইনে কমপক্ষে এক মাস এবং সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাবাস, ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা অর্থ বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিতের বিধান রাখলেও বাস্তবিক অর্থে আইনের প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়।

ইএ