গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) এবং মর্জিনা বেগম (৩৯)। তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে আজ (বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর) তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। এসময় মর্জিনা বেগম আদালতে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ।
পুলিশ সুপার মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার বিজয়নগর গ্রামের ইদ্রিস আলী (৫৪) জীবিকার জন্য লিবিয়ায় অবস্থান করছিলেন। গত বছরের ১৭ মার্চ স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা এলাকায় বাসার সামনে তিনটি গাড়িতে করে সশস্ত্র একদল ব্যক্তি এসে তাকে ঘিরে ফেলে। পরে অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়।
অপহরণকারীরা ইদ্রিস আলীর চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নিয়ে তার পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, টাকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায়। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা গাড়িতে নেয়ার পর অজ্ঞাত একটি ভবনের কক্ষে তাকে আটকে রাখা হয়।
দুই দিন পর তাকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে বাংলাদেশে থাকা তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে ইমোতে ভিডিও কলের মাধ্যমে তা দেখানো হয়। একই সঙ্গে ইদ্রিস আলীকে হত্যার হুমকি দিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
প্রথম দফায় একটি ইসলামী ব্যাংক হিসাব নম্বরে ২০ লাখ টাকা পাঠাতে বলা হয়। স্বামীর জীবন বাঁচাতে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে গত বছরের ১৯ মার্চ ফাতেমা বেগম ২০ লাখ টাকা পাঠান।
তবে টাকা পাওয়ার পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। কিছুদিন পর অপহরণকারীরা আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে ইদ্রিস আলীকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, এসময় লোহার রড দিয়ে মারধরের কারণে ইদ্রিস আলীর ডান পা ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। তাকে অনাহার-অর্ধাহারে রাখা হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
পরবর্তীতে স্বামীর জীবন রক্ষায় ফাতেমা বেগম আরও টাকা দিতে বাধ্য হন। গত বছরের ৬ এপ্রিল জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ২৮ লাখ টাকা মঞ্জু নামের এক ব্যক্তির শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৪ লাখ টাকা রেখে বাকি ২৪ লাখ টাকা পরদিন মর্জিনা বেগমের ইসলামী ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। একই সময়ে আসামিদের দেয়া একটি বিকাশ নম্বরেও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠানো হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে ইদ্রিস আলীর পরিবারের কাছ থেকে মোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
দীর্ঘ এক মাস ১৪ দিন আটকে রাখার পর গত বছরের ৮ এপ্রিল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইদ্রিস আলীর চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে ত্রিপোলির মদিনা এলাকায় রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা। পরে লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় ২০২৫ সালের ২২ জুলাই দেশে ফেরেন তিনি।
দেশে ফিরে ইদ্রিস আলী চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁও থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
পুলিশ জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকা থেকে উত্তম সরকার ওরফে সুমন ও মর্জিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর তাদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পিবিআইয়ের দাবি, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্র বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেট করে অপহরণ করত বলে স্বীকার করেছেন।
তদন্তে চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।




