জ্বালানির দাম বৃদ্ধি: মূল্যস্ফীতির চাপে কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

জ্বালানি তেল, একটি বাজারের চিত্র
জ্বালানি তেল, একটি বাজারের চিত্র | ছবি: এখন টিভি
0

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কি উস্কে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতিকে? নতুন করে দাম বাড়ায় প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। এতে বাধ্য হয়ে কেনাকাটায় কাঁটছাট করছেন ক্রেতারা। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চাপ বাড়ছে অর্থনীতির ওপর। এমন অবস্থায় বাজার ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থা সহজ করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।

বাজারে এলেই যেন ক্রেতারা অসহায়। উচ্চমূল্যের কারণে ছোট হয়ে আসছে বাজারের ব্যাগ। চাহিদার চেয়েও কম কেনাকাটা করছেন অনেকেই।

মোহাম্মদপুরের বাজারে নিয়মিত বাজার করেন আব্দুর রব। পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী হলেও বাড়তি দাম মেটাতে হিমশিম অবস্থা তার। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি পণ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি দাম মেটাতে হচ্ছে তাকে।

আব্দুর রব বলেন, ‘আমি তো আমার জীবনযাত্রার জন্য শুধু যে বাজার করবো তা না। আমি ওষুধ কিনব, তেল কিনবো, আমি বাস ভাড়া দেবো।’

তার চেয়ে কম আয়ের মানুষের কেনাকাটা তো আরও কষ্টের। স্বল্প ও নিম্ন আয়ের ক্রেতাদের ওপর এসেছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপ। যাদের আয় না বাড়লেও বাড়ছে সংসার চালানোর খরচ।

আরও পড়ুন:

বাজার করতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বলেন, ‘নন্দিন জীবনে তো মাছ-গোশত কিনিই না। এই তো তরকারি, ভাজি-টাজি খাই। মাস শেষে ঘরভাড়া বেজে যায়, দোকানভাড়া বেজে যায়, এই কারিগরদের বেতন দিতে বেজে যায়। সমস্যা, খুব সমস্যা।’

বিক্রেতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘১৫০ টাকার ডিম এখন ১৭০ টাকায় আজকে বিক্রি হচ্ছে ডজন। তো এটা সামনে কতটুক বাড়বে জানি না। ট্রান্সপোর্টেশনের কস্ট বেড়ে যাবে। ফুয়েল জ্বালানি কস্ট বেড়ে গেছে। এখন এটার প্রভাব তো আরও কয়েক দিনে আরও বড় আকারে দেখবে।’

তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়ও। এতে চাপ বাড়ছে সাধারণের ওপর।

গাড়ি চালকদের মধ্যে একজন বলেন, ‘হঠাৎ ২০ টাকা ভাড়া বাড়ায় দিছে। আমগো লস অইতে আছে। কী কইরা খামু কন?’

অন্য আরেকজন বলেন, ‘আগে ৫০০ টাকায় ট্রিপে যাইতাম। অহন ওই জায়গায় যদি পার্টির কই যে ৫০টা টাকা বাড়ায়া দেন, কয় কিসের টাকা বাড়ায় দিমু?’

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, গেল কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করছে। চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশ, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সে সময় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে। তবে আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসে ৮.৪২ শতাংশে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘জনগণ এমনিতেই চাপের মধ্যে। কারণ বেকারত্ব অনেক বেশি, অনেক কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান নাই, নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এরকম একটা দারিদ্র্য এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ যখন আছে, তখন সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে এই তেলের দাম বৃদ্ধিটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না।’

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চাপ বাড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন করে তেলের দাম বৃদ্ধি খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকার ওপর চাপ বাড়াবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়বে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গরিব মানুষদের ওপর। কারণ ধনী মানুষের যারা অনেক টাকা আয় করে, তাদেরকে বেশি প্রভাব ফেলে না। কিন্তু জীবিকার ওপর আঘাত হানি হচ্ছে গরিব মানুষদের ক্ষেত্রে। অতএব এই বর্তমান যে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সেটা স্বাভাবিকভাবেই আমি বলবো উচ্চ মূল্যস্ফীতির জায়গায় আরেকটা জীবিকার ওপর হুমকি হয়ে দাঁড় করালেন।’

আরও পড়ুন:

এদিকে জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ লাখ চাকরিজীবীর বেতন বাড়ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর প্রভাবে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে আরেক দফা। তবে নতুন বেতন কাঠামোর বাড়তি অর্থের যোগান কি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে?

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পে স্কেলের সাথে বাজেট ঘাটতির অর্থায়নও বড় চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে।

অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘পে স্কেল করে আপনি কিছু লোককে সুবিধা দিচ্ছেন, কিন্তু তার বদলে তাদেরটাও কেড়ে নিচ্ছেন। আবার এটার টাকা জোগান দেওয়ার জন্য আপনি সকল মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছেন, এ তো হবে না।’

অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘সার্বিকভাবে বিশাল বাজেট দেয়া, আয়ের তুলনায় ব্যয়ের পরিমাণটা বেশি করা। এই ব্যয়ের পরিমাণটা বেশি করতে হয়েছে, কারণ হচ্ছে পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে। অতএব তার একটা ঝুঁকি বলছি, কারণ মূল্যস্ফীতিকে যেহেতু বাড়ানোর একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কারণ আয় সেই পরিমাণ না বাড়ার কারণে।’

দ্রব্যমূল্য নিম্নমুখী ধারায় ফিরবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনাকে সহজীকরণ করতে সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ অর্থনীতি বিশ্লেষকদের।

এসএস