ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শ্রীলঙ্কান পোশাক কোম্পানির; চট্টগ্রামে শ্রমিকদের স্বীকৃতি ‘স্বর্ণমুদ্রায়’

পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করছেন; ইনসেটে পুরস্কার হিসেবে দেয়া স্বর্ণমুদ্রা
পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করছেন; ইনসেটে পুরস্কার হিসেবে দেয়া স্বর্ণমুদ্রা | ছবি: এখন টিভি
0

বয়স বেশি হলে উৎপাদনশীলতা কমে, এমন ধারণা থেকে ৪০ বছরের বেশি নারী কর্মীদের রাখতে চায় না কারখানা মালিকরা। এমন ধারণার বেড়া ডিঙিয়ে উদাহরণ তৈরি করেছে চট্টগ্রাম কর্ণফুলী ইপিজেডের শ্রীলঙ্কান পোশাক কোম্পানি ম্যাস ইন্টিমেইটস বাংলাদেশ। কর্মীদের নিষ্ঠা ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতি বছরই পুরস্কার হিসেবে দিচ্ছে স্বর্ণমুদ্রা।

মাহেশ, শারাদ ও অজয় আমালিন— তিন ভাইয়ের হাত ধরে ১৯৮৭ সালে শ্রীলঙ্কায় পথচলা শুরু করে ‘ম্যাস হোল্ডিং’, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের ১৪টি দেশে কারখানা স্থাপন করেছে ম্যাস হোল্ডিং, যাতে কাজ করছে লক্ষাধিক কর্মী।

২০১০ সালে চট্টগ্রাম কর্ণফুলী ইপিজেডে ম্যাস ইন্টিমেইটস নামে পথচলা শুরু এই পোশাক শিল্পের। বর্তমানে কাজ করছেন পাঁচ হাজার কর্মী। কোম্পানির সাফল্য ও কর্মীদের জন্য প্রণোদনা পোশাকের জগতে এখন অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত।

অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাটাই যেখানে নিয়মিত ঘটনা, সেখানে কর্ণফুলী ইপিজেডের শ্রীলঙ্কান কোম্পানি ম্যাস ইন্টিমেইটস প্রতি পাঁচ বছর পর পর কর্মীদের উৎসাহ যোগাতে দিচ্ছে স্বর্ণমুদ্রা। ব্যতিক্রমী এ অ্যাওয়ার্ডের প্রতিদান হিসেবে কর্মীরাও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে উজাড় করে দিচ্ছেন নিজেদের। যার ফলে বিশ্বের ১৬টি দেশের নামীদামী ফ্যাশেনেবল ব্র্যান্ডের আস্থা অর্জন করেছে ইন্টিমেইটস।

চাকরিতে যোগদানের ৫ বছর পর কর্মজীবনে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রত্যেক কর্মীকে ম্যাস ইন্টিমেইটস সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড হিসেবে দিচ্ছে স্বর্ণমুদ্রা। ২২ ক্যারটের ৪ গ্রাম ওজনের এই স্বর্নমুদ্রার বাজার মূল্য প্রায় ৮০ হাজার টাকা। কর্মজীবন যত দীর্ঘ হয় পুরস্কারের ঝুলিও তত বড় হয়। স্বর্নমুদ্রা দিয়ে অনেকই পরিবারের সদস্যদের জন্য গহনা বানিয়েছেন। কেউ বা রেখে দিয়েছেন ভবিষ্যত সঞ্চয় হিসেবে।

স্বর্ণমুদ্রা জয়ী কর্মী বিশাখা মুৎসুদ্দী বলেন, ‘এটি শুধু একটি অ্যাওয়ার্ড নয়। এটি আমাদের দীর্ঘদিন ম্যাসে থাকার কারণে আমাদের কমিটমেন্ট, প্রচেষ্টা এবং কোম্পানির প্রতি কন্ট্রিবিউশন—তার একটি স্বীকৃতি।’

স্বর্ণমুদ্রা জয়ী কর্মী ঝুমুর বেগম বলেন, ‘এটা পেয়ে আমার কাজের প্রতি আরও উৎসাহ বেড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এটা আমার একটা পরিবারের মতো হয়ে গেছে। এখানে খুব ভালো লাগে এবং উপভোগ করি।’

স্বর্ণমুদ্রা জয়ী আরেক কর্মী মো. আকাশ বলেন, ‘এ বছরও একটি গোল্ড কয়েন পেয়েছি। হয়তো আমার ছেলে বা মেয়ের কোনো কাজে লাগাবো।’

ব্যতিক্রমী এ পুরস্কারের গল্প প্রসঙ্গে ইন্টিমেইটসের এক কর্মকর্তা জানান, কর্মীদেৱ নিষ্ঠা, আস্থা ও অঙ্গীকারকে সম্মান করে ইন্টিমেটস। এ পুরস্কার প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে।

প্রতিষ্ঠানটির মানব সম্পদ ও প্রশাসনের প্রধান নূরানি মুতালিফ বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মী এই পুরস্কার পেয়েছেন। অনেক কর্মী ১০ ও ১৫ বছর মেয়াদে দুই থেকে তিন বার স্বর্ণমুদ্রা পেয়েছেন। জীবনের ১৫ থেকে ২০ বছর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকা বিশাল ব্যাপার। এসব কর্মী তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। এ পুরস্কারের মাধ্যমে কোম্পানি তাদের আস্থা, কর্মনিষ্ঠা ও অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে।’

শুধু পুরস্কারই নয়, জীবনমান উন্নয়নে প্রতি বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরির কর্মীদের পাঠানো হয় অন্যান্য দেশের ম্যাস’র কারখানায়। চট্টগ্রাম ইপিজেড ও কর্ণফুলী ইপজেডের দু’টি কারখানা থেকে বছরে ১০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

নূরানি মুতালিফ বলেন, ‘বাংলাদেশে পোশাকখাতে ম্যাস দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা ও জীবনমান উন্নয়নে পাঠানো হচ্ছে শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ ম্যাস-এর অন্যান্য দেশে স্থাপিত কারখানায়। কর্মীরা সেখানে থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগান নিজ প্রতিষ্ঠানে। কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বগুণের কারণে ম্যাস-এর কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভালো কদর আছে। শ্রীলঙ্কার পোশাক রপ্তানির বাজার মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান রপ্তানির বাজার ধরতে চট্টগ্রাম ইপিজেডের কারখানাটি সম্প্রসারণ করা হবে।’

নাইকি, পিভিএইচ, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, ভিক্টোরিয়া সিক্রেট, হুগো, বসসহ ইউরোপ-আমেরিকার নামকরা অনেক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ম্যাস’র ক্রেতা।

এসএইচ