বিদ্রোহের বাতিঘর নজরুল আজও অমলিন।
আমি চির-বিদ্রোহী বীর -
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
দ্রোহ আর প্রেমকে এক সুতোয় বেঁধেছেন কবি নজরুল। কখনো রণতূর্যের বার্তা, কখনওবা বাঁশির সুরে মোহিত করেছেন। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নজরুল যেন হয়ে ওঠেন মহাপ্রলয়ের নটরাজ। যার প্রতিবাদী লেখনীতে সাম্যের জয়গান।
নজরুলের মতো করে কে পেরেছে আমাদের জাগাতে? যুগে যুগে সংগ্রাম আর বিদ্রোহের দিনগুলোতে নজরুল এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা। সাহিত্যের বাইরে সামাজিক-রাজনৈতিক নবজাগরণে যার প্রাসঙ্গিকতা আজও উজ্জ্বল ধ্রুবতারার মতো।
বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক চিন্তার এক অতলস্পর্শ দ্রষ্টা কাজী নজরুল। যার মূল দর্শন অসাম্প্রদায়িকতা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আর পাকিস্তানি শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে কবিকণ্ঠ ছিল বলিষ্ঠ। কবি নেই, কিন্তু তার অবিনাশী গান-কবিতা এখনও রসদ যোগায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
আবৃত্তিকার টিটো মুন্সী বলেন, ‘নজরুলের যে সাম্যের গান, এটা একটা অভাবনীয় ব্যাপার। যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান। যেখানে মিশেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান—গাহি সাম্যের গান। মানে সকল ধর্ম থাকবে, ধর্মহীনতা যদি থাকে তাও থাকবে। কিন্তু সকলে থেকে একটা সুন্দর প্রতিষ্ঠান, সমাজ—এটা নজরুল অনন্য। বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে! দেখিয়া-শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে! রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা, তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা।’
গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নজরুল ছিলেন এক আশ্রয়স্থল। নবযুগ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে গণতন্ত্রের বার্তা দিয়েছেন সমাজে। গণমানুষের মুক্তি আর সাম্যের গল্পই ছিল যার প্রতিপাদ্য।
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের যে বাণী উচ্চারণ করে গেছেন জীবনভর, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তনে সে প্রাসঙ্গিকতা ফুরাবার নয়।
ময়মনসিংহ ইন্সটিটিউট অব নজরুল স্টাডিজের অতিরিক্ত পরিচালক রাশেদুল আলম বলেন, ‘সবগুলি পত্রিকা যদি আমরা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব যে তিনি এই ভারতবর্ষের মানুষের মুক্তির কথা বলেছিলেন। এই মুক্তিটা কী? এই মুক্তিটা হচ্ছে গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আমরা আজকে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। তার যে কাব্য, তার যে সংগীত, সে জায়গায় তিনি মানুষের জয়গান গেয়েছেন। নতুন প্রজন্ম, আমরা গণতন্ত্রের যে প্রকৃত মূল ভিত্তি, সেটাকে নজরুলের আদর্শে এগিয়ে যাবো।’
গণতন্ত্র আর বিপ্লবীদের মুখপাত্র হিসেবে দ্বিতীয় পত্রিকা ধূমকেতু প্রকাশ করেন তিনি। অকুতোভয় লেখনী আর স্বাধীনতাকামী নজরুলকে বারবার সইতে হয়েছে শোষকের বঞ্চনা। রাজদ্রোহের অভিযোগে পত্রিকা বন্ধসহ কারারুদ্ধ হতে হয় তাকে। কিন্তু নজরুল যেন অদম্য। সমস্ত অসমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ১৯২৬ সালে লড়েন সাধারণ নির্বাচনেও।
নজরুলের দর্শনে রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাম্য প্রতিষ্ঠার যে লড়াই আর আহ্বান ছিল তা অনুসরণ-যোগ্য। শোষণের বিরুদ্ধে নজরুলের রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত থাকবে যুগ-যুগান্তরে।
কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ বলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, বৈষম্যহীন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটা জাতি গঠনে নজরুলের কাছে আমরা বারবার যাবো, আশ্রয় নেব। তার চিন্তা-চেতনা, তার আদর্শ, তার যে বিপুল কর্মসম্ভার, সেগুলি থেকে আমরা দীক্ষা নেব। আমাদের নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করব। নজরুল, জয়তু নজরুল।’
রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য নজরুলের অহং জাতীয়তাবাদের চেতনার প্রতিচ্ছবি। মহাকালের ধূমকেতু নজরুলের সেই চেতনায় উজ্জীবিত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। প্রত্যাশা গবেষকদের।





