মাইক্রোপ্লাস্টিক কী, যেভাবে প্রবেশ করছে মানবদেহে

মাইক্রোপ্লাস্টিক
মাইক্রোপ্লাস্টিক | ছবি: সংগৃহীত
0

সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া; প্রায় সর্বত্রই মিলছে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সাম্প্রতিক গবেষণায় মানবদেহের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, প্লাসেন্টা এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও এই কণার উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু পরিবেশের জন্য নয়, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্যও একটি নীরব হুমকি।

কী এই মাইক্রোপ্লাস্টিক?

সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। বড় প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, জাল, টায়ার কিংবা অন্যান্য প্লাস্টিকজাত পণ্য সময়ের সঙ্গে ভেঙে এসব ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এছাড়া প্রসাধনী, সিন্থেটিক পোশাক ও বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকেও সরাসরি মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা মাইক্রোপ্লাস্টিককে দুই ভাগে ভাগ করেন, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি। প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক শুরু থেকেই ক্ষুদ্র আকারের থাকে, আর সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক বড় প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হয়।

যেভাবে মানবদেহে প্রবেশ করে

গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক বিভিন্ন উপায়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

খাবার ও পানির মাধ্যমে: প্লাস্টিকের বোতলের পানি, প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষিত বা গরম করা খাবার, সামুদ্রিক মাছ, শস্য, ফলমূল এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মাধ্যমে এসব কণা শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে: ঘরের ধুলাবালি, সিন্থেটিক কাপড়ের ক্ষুদ্র তন্তু এবং শিল্পাঞ্চলের বাতাসে থাকা প্লাস্টিক কণা প্রতিনিয়ত মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করছে।

মা থেকে শিশুর শরীরে: গবেষণায় প্লাসেন্টা ও বুকের দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে গর্ভকালীন সময়ে বা স্তন্যপানের মাধ্যমেও শিশুর শরীরে এসব কণা প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।

ত্বকের মাধ্যমে: ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক বা কিছু প্রসাধনী ব্যবহারের মাধ্যমে অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন উৎপাদন শিল্পে কর্মরত ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এছাড়া শিশু, বয়স্ক এবং দূষিত পরিবেশে বসবাসকারীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি বলে মনে করছেন গবেষকরা।

আরও পড়ুন

কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে?

যদিও মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে, তবে বিভিন্ন গবেষণায় সম্ভাব্য যেসব ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

* ফুসফুসে প্রদাহ ও শ্বাসকষ্ট

* হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালির জটিলতা

* অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও কোষের ক্ষতি

* হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

* রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া

* প্রজননজনিত সমস্যা

* শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে বাধা

* ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্ভাবনা

* ঝুঁকি কমানোর উপায়

আরও পড়ুন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে কিছু সতর্কতা মেনে চললে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ অনেকটাই কমানো সম্ভব। যেমন— একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো; গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে না রাখা; সম্ভব হলে কাঁচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ও পাত্র ব্যবহার করা।

ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা; সিন্থেটিক পোশাকের পরিবর্তে প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া; প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যেরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। তাই প্লাস্টিক দূষণ কমানোর পাশাপাশি এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

এনএইচ