কিউআর কোড থেকে সাবধান, স্ক্যান করতেই খালি হচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট!

কিউআর কোড স্ক্যাম থেকে বাঁচার উপায়
কিউআর কোড স্ক্যাম থেকে বাঁচার উপায় | ছবি: এখন টিভি
0

স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের এই যুগে আমাদের জীবনকে সবচেয়ে সহজ করেছে যে প্রযুক্তিটি, তা হলো কিউআর কোড। শপিং মলে বিল দেওয়া, রেস্তোরাঁর মেনু কার্ড দেখা, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট কিংবা ঝটপট কোনো ওয়েবসাইটে সাইন-আপ করতে এখন আর টাইপ করার প্রয়োজন হয় না; শুধু ক্যামেরার এক ক্লিকেই কাজ শেষ (QR Code Scams and Cyber Security Risks)।

তবে এই সহজ প্রযুক্তির উল্টো পিঠে রয়েছে এক বড় বিপদের হাতছানি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC) এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে অচেনা বা সন্দেহজনক কোনো সোর্স থেকে কিউআর কোড স্ক্যান করা (Scanning QR Code Risks) আপনার জীবনের বড় ধরনের আর্থিক ও ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

আরও পড়ুন:

কিউআর কোড আসলে কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে? (What is QR Code and How it Works)

আমরা সুপারশপের পণ্যের গায়ে যে চিরাচরিত বারকোড (Barcode) দেখি, কিউআর কোড হলো তারই উন্নত সংস্করণ। বারকোড কেবল হরাইজন্টালি বা পাশাপাশি তথ্য জমা রাখতে পারে। অপরদিকে, কিউআর বা কুইক রেসপন্স কোড (Quick Response Code) লম্বালম্বি এবং আড়াআড়ি দুই ভাবেই ডেটা সংরক্ষণ করে। ফলে এতে বারকোডের চেয়ে শত গুণ বেশি তথ্য আঁটে।

কম্পিউটারের চেনা বাইনারি কোড (Binary Code) অর্থাৎ ‘১’ ও ‘শূন্য’ এর বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে এই কালো-সাদা বিন্দুগুলোর নকশা তৈরি হয়। এই নকশার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে নির্দিষ্ট কোনো ইউআরএল বা ওয়েবসাইটের ঠিকানা। কিউআর কোডের তিন কোণায় থাকা তিনটি বড় চারকোনা বাক্সকে বলা হয় পজিশন মার্কার (Position Markers), যা দেখে ফোনের ক্যামেরা বুঝতে পারে কোডটি সোজা নাকি উল্টো আছে। এর আরেকটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হলো ডেটা রিডান্ডেন্সি (Data Redundancy)। অর্থাৎ কোডের ৩০ শতাংশ অংশ ছিঁড়ে বা নষ্ট হয়ে গেলেও এর ভেতরের মূল তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব।

আরও পড়ুন:

যেখানে লুকিয়ে আছে হ্যাকারদের ফাঁদ: প্রধান ৩টি ঝুঁকি (Cyber Attack via QR Code Phishing)

কিউআর কোড নিজে কোনো ভাইরাস বা বোমা নয়, এটি কেবল তথ্য রাখার একটি পাত্র। কিন্তু সাইবার অপরাধীরা একে ব্যবহার করছে ম্যালওয়্যার ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে। মূলত ৩টি উপায়ে গ্রাহকেরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন:

১. ফিশিং লিংক বা ফাঁদ: স্ক্যান করার পর কোডটি আপনাকে হুবহু আপনার ব্যাংকের বা ফেসবুকের মতো দেখতে একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যাবে। সেখানে ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড দিলেই হ্যাকাররা আপনার অ্যাকাউন্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। একে প্রযুক্তি পরিভাষায় কুইশিং বা কিউআর কোড ফিশিং (Quishing or QR Code Phishing) বলা হয়।

২. অটোমেটিক অ্যাপ বা ম্যালওয়্যার ডাউনলোড: কিছু ক্ষতিকর কোড স্ক্যান করার সাথে সাথেই ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো অ্যাপ বা স্পাইওয়্যার সাইলেন্টলি ডাউনলোড হয়ে যায়, যা আপনার ওটিপি (OTP) ও ব্যক্তিগত মেসেজ চুরি করতে পারে।

৩. স্ক্যানার অ্যাপের দুর্বলতা: অনেক সময় খোদ থার্ড-পার্টি স্ক্যানার অ্যাপেই ত্রুটি থাকে। ফলে কোনো লিংকে ক্লিক না করলেও শুধু কোডটি রিড করার কারণেই ফোনের নিরাপত্তা ভেঙে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন:

কিউআর কোড স্ক্যাম থেকে সুরক্ষিত থাকার উপায় (How to Avoid QR Code Scams)

প্রযুক্তি আমাদের বন্ধু, তবে অন্ধ বিশ্বাস করলে এটিই শত্রুতে পরিণত হতে পারে। নিরাপদ থাকতে বিশেষজ্ঞরা নিচের পরামর্শগুলো মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন:

ইউআরএল ভালো করে যাচাই করুন: স্ক্যান করার পর স্ক্রিনে যে ওয়েবসাইটের লিংক বা ইউআরএল (URL URL Check) দেখাবে, তা ভালো করে লক্ষ্য করুন। নামের বানান ঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে তবেই ক্লিক করুন।

লোগো দেখে অন্ধ বিশ্বাস নয়: পরিচিত কোনো ব্র্যান্ডের লোগো কিউআর কোডের মাঝে দেখলেই তা আসল মনে করবেন না। হ্যাকাররা সহজেই লোগো নকল করতে পারে।

থার্ড-পার্টি অ্যাপ বর্জন করুন: কিউআর কোড রিড করার জন্য প্লে-স্টোর থেকে আজেবাজে থার্ড-পার্টি অ্যাপ নামাবেন না। ফোনের ডিফল্ট ক্যামেরা বা বিশ্বস্ত কোম্পানির নিজস্ব স্ক্যানার ব্যবহার করুন।

পাবলিক প্লেসে সতর্কতা: রাস্তাঘাট, বাস স্টপ বা লিফটে হুট করে সেঁটে দেওয়া কোনো অপরিচিত কিউআর কোড (Unverified QR Code Scan Warning) স্ক্যান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।

আরও পড়ুন:

একনজরে কিউআর কোডের কার্যপদ্ধতি, সাইবার ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নির্দেশনা

অনলাইন ব্যাংকিং বা মোবাইল রিচার্জের ক্ষেত্রে কেবল অফিশিয়াল মার্চেন্ট কাউন্টারে থাকা কিউআর কোডই ব্যবহার করুন।

প্রযুক্তি ও বিষয় (Topic) কার্যকারিতা ও হ্যাকিংয়ের ফাঁদ (Function & Risks) সুরক্ষা কৌশল (Safety Rules)
বারকোড বনাম কিউআর
(Barcode vs QR Code)
বারকোড শুধু পাশাপাশি তথ্য রাখে। কিউআর কোড লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি (বাইনারি কোড) দুইভাবেই শত গুণ বেশি ডেটা ধারণ করে। কুইক রেসপন্স টেকনোলজি
পজিশন মার্কার ও লোগো
(Markers & Redundancy)
৩ কোণায় থাকা বাক্স ক্যামেরা সোজা রাখতে সাহায্য করে। ৩০% অংশ নষ্ট হলেও 'ডেটা রিডান্ডেন্সি'র কারণে এর তথ্য উদ্ধার সম্ভব। স্মার্ট ডিজাইন বৈচিত্র্য
ফিশিং বা কুইশিং ফাঁদ
(QR Code Phishing)
স্ক্যান করলে হুবহু আসল সাইটের মতো ভুয়া লিংকে নিয়ে যায়। সেখানে পাসওয়ার্ড বা ওটিপি দিলে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়। অন্ধভাবে লিংক ক্লিক নয়
অটোমেটিক ম্যালওয়্যার
(Malware Download)
ব্যবহারকারীর অজান্তেই ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্ষতিকর স্পাইওয়্যার বা অ্যাপ ডাউনলোড করে ফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। অচেনা সোর্স বর্জন করুন
স্ক্যানার অ্যাপের ত্রুটি
(App Vulnerabilities)
প্লে-স্টোরের অনেক থার্ড-পার্টি স্ক্যানার অ্যাপে নিরাপত্তা দুর্বলতা থাকে, যা শুধু কোড রিড করলেই ভাইরাস ছড়ায়। ডিফল্ট ক্যামেরা ব্যবহার
নিরাপত্তা টিপস: ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের এফটিসি (FTC) কিউআর কোড স্ক্যাম নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে। যেকোনো কোড স্ক্যান করার পর স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ইউআরএল (URL) ভালো করে মিলিয়ে নিন। প্রযুক্তিকে বন্ধু বানান, তবে অন্ধ বিশ্বাস সাইবার বিপদের মূল কারণ হতে পারে।

এসআর