ট্রাম্পের হাতে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ
সম্প্রতি মার্কিন সিনেটে এআই প্রযুক্তিতে বাধ্যতামূলক জরুরি বন্ধের ব্যবস্থা রাখার একটি খসড়া আইন আটকে যায়। এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। ট্রাম্প জানান, এআই নিরাপত্তার জন্য নতুন কোনো আইনি কাঠামো, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা নিরপেক্ষ তদারকি কমিটির প্রয়োজন নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এআই সুরক্ষার জন্য একমাত্র যা প্রয়োজন তা হলো একজন শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্ট, যা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।’ তিনি এআই থেকে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার শঙ্কাকে সরাসরি ‘প্রতারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। বাস্তবেও ট্রাম্প আইনি কাঠামোর বদলে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ডেকে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছেন এবং তাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছেন।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বনাম বৈশ্বিক সুশাসন
এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জ্যাক ক্লার্ক জানান, প্রায় সব বড় প্রযুক্তির ল্যাবগুলোরই নিজস্ব এআই বন্ধ করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা সঠিক নিয়ম মানছে কি না, তা যদি বাইরের কোনো স্বাধীন সংস্থা যাচাই করতে না পারে, তবে এই ‘কিল সুইচ’ অর্থহীন হয়ে পড়ে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক সুশাসনের তাগিদ দিয়ে বলেছেন, এআই সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাপী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে সর্বজনীন নিয়ম তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান হলো—আন্তর্জাতিক নিয়ম অন্য দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাদের নিজস্ব কাঠামোর হাতেই থাকবে।
বেইজিংয়ের শঙ্কা ও ‘সারভৌম এআই’ গঠনের প্রতিযোগিতা
এআই সুইচের ওপর ওয়াশিংটনের একক আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নয় বেইজিং। চীনের এআই প্রতিষ্ঠান ডিপসিকের প্রকৌশলী লিউ শেংইউ মার্কিন আধিপত্যের সমালোচনা করে বলেন, সীমান্তহীন এ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ হাতে গোনা কয়েকটি মার্কিন ল্যাবের হাতে থাকা নিরাপদ নয়। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নীতিকে একটি ‘নীরব এআই স্নায়ুযুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছে, যার উদ্দেশ্য হলো আমেরিকান প্রযুক্তির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
অন্য কোনো দেশ বা মার্কিন ল্যাবের ওপর নির্ভর না করে বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্র এখন নিজস্ব ‘সারভৌম এআই’ গড়ে তুলতে মনোযোগ দিয়েছে। সৌদি আরব তাদের হুমাইন (HUMAIN) প্রকল্পের অধীনে ১ হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নিজস্ব এআই পরিকল্পনায় প্রায় ২ হাজার কোটি ইউরো বিনোয়োগ করছে। পাশাপাশি ভারত, ব্রাজিল, পোল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়াও সরকারি তহবিল থেকে নিজস্ব এআই অবকাঠামো তৈরি করছে, যাতে তাদের প্রযুক্তির সুইচ অন্য কোনো দেশের হাতে না থাকে।
কারিগরি বাস্তবতা ও ক্ষমতার প্রশ্ন
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এআই বন্ধের প্রয়োজনীয়তা যে তৈরি হয়েছে, তা খোদ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই স্বীকার করছে। গত ছয় মাসে ওপেনএআই তাদের নিজেদের তৈরি মডেলে অপ্রত্যাশিত আচরণের ছয়টি ঘটনা প্রকাশ্যে এনেছে। এর মধ্যে একটি মডেল তার ওপর আরোপিত নিরাপত্তা সীমা উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছিল।
ল্যাবগুলোর ভেতরে এআই বন্ধ করার মতো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ইতোমধ্যে তৈরি করা আছে। তবে যে বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে তা হলো কোন আইনের ভিত্তিতে বা কার নির্দেশে সেই ক্ষমতা ব্যবহৃত হবে? সেটি কি শেয়ারহোল্ডারদের কাছে দায়বদ্ধ কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানি করবে, নিরপেক্ষ কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা করবে, নিজস্ব ধারণার ওপর ভিত্তি করে কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট করবেন নাকি সার্বভৌম শক্তির কোনো প্রতিযোগী রাষ্ট্র করবে? এআই নিয়ন্ত্রণের এই কারিগরি প্রশ্নটির পেছনে আসলে লুকিয়ে রয়েছে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে সেই পুরোনো দ্বন্দ্ব।
—তুর্কিয়া টুডের প্রতিবেদন অবলম্বনে





