সাত বছর একা, ঘরের কোণ থেকে শুরু
কাতালোনিয়া পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাল্টিমিডিয়া ও ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা শেষ করা মার্কো গ্রোসি নিজের একটি সাধারণ প্রয়োজন মেটাতে প্ল্যাটফর্মটির কোডিং শুরু করেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর তিনি নিজের ঘরে বসেই একা পুরো ওয়েবসাইটের কাজ সামলেছেন। প্রতিদিন ভিজিটরের সংখ্যা যখন দুই থেকে তিন লাখে পৌঁছায়, তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধুকে প্রথম কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ৪৩ জন কর্মী রয়েছেন। গ্রোসি জানান, কর্মীদের কাজের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে তারা ধীরলয়ে এগিয়েছেন; এমনকি সবচেয়ে বেশি নিয়োগের বছরেও মাত্র ১০ জনকে নেয়া হয়েছিল।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনাকারী পোর্টাল এএইচরেফস ডটকমের ২০২৪ সালের তথ্যানুযায়ী, আইলাভপিডিএফ বিশ্বের ৩৪তম সর্বাধিক পরিদর্শিত ওয়েবসাইট। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ নিয়মিত তাদের এই সেবা ব্যবহার করছেন।
বিনিয়োগকারী নেই, বিক্রির ইচ্ছাও নেই
বর্তমান ডিজিটাল স্টার্টআপ দুনিয়ায় যেখানে বাইরের বিনিয়োগ আর অতি দ্রুত মুনাফার পেছনে ছোটার প্রবণতা প্রবল, সেখানে গ্রোসি সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে অটল। তিনি বলেন, ‘আমাদের পেছনে কোনো বিনিয়োগকারী নেই, কখনো ছিল না এবং আমরা কাউকে খুঁজছিও না।’
প্ল্যাটফর্মটি অধিগ্রহণের প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট জানান, বিক্রির কোনো প্রস্তাব তিনি খুলেও দেখেন না। গ্রোসি বলেন, ‘আমার মধ্যে কখনো উদ্যোক্তা মানসিকতা ছিল না। বিক্রির প্রস্তাবগুলো আমি খুলেও দেখি না, কারণ এগুলোর শেষ পরিণতি কী হয় তা আমার জানা। প্রতিদিন সকালে সাইকেল চালিয়ে অফিসে আসা এবং দলের সঙ্গে কাজ করতে পারাটাই আমাকে আনন্দ দেয়। আমি আশা করি প্রতিষ্ঠান বিক্রির কথা আমাকে কখনো ভাবতে হবে না।’
যেভাবে চলে এই প্ল্যাটফর্ম
আইলাভপিডিএফ মূলত ফ্রিমিয়াম মডেলে পরিচালিত হয়। পিডিএফ ফাইল একত্র করা, আলাদা করা, সাইজ ছোট করা, রূপান্তর, সম্পাদনা ও ডিজিটাল স্বাক্ষরের মতো মূল ফিচারগুলো সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত। গ্রোসির ভাষ্যমতে, তাদের এই বিনামূল্যের সেবা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যবহারকারীর স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটাতে পুরোপুরি সক্ষম।
প্রতিষ্ঠানটির আয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসে মূলত করপোরেট ও প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন থেকে, যার প্রধান গ্রাহক বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। মাসিক প্রায় চার ডলারের এই সেবায় অফলাইনে কাজ করার সুযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ওসিআর প্রযুক্তির মাধ্যমে পিডিএফ থেকে ওয়ার্ডে রূপান্তরের সুবিধা থাকে। অবশিষ্ট আয় আসে সাধারণ ব্যানার বিজ্ঞাপন থেকে।
তথ্যের পূর্ণ নিরাপত্তা
বিনামূল্যের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে ব্যবহারকারীদের তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে প্রতিষ্ঠানটি। গ্রোসি জানান, প্ল্যাটফর্মে আপলোড করা সব ধরনের পিডিএফ ফাইল দুই ঘণ্টার মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্ভার থেকে মুছে ফেলা হয়। এতে তৃতীয় পক্ষ তো বটেই, এমনকি প্রতিষ্ঠানের কারও ফাইলের অ্যাকসেস করা সুযোগ থাকে না। প্ল্যাটফর্মটি আন্তর্জাতিক আইএসও ২৭০০১ সনদপ্রাপ্ত এবং নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়।
সাদামাটা জীবন ও আধুনিক দর্শন
ইতালীয় পিতা ও স্প্যানিশ মায়ের সন্তান ৩৯ বছর বয়সী গ্রোসি বার্সেলোনাতেই বড় হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে তার তৈরি টুলের বিপুল জনপ্রিয়তা থাকলেও তিনি নিজেকে প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে গ্রোসি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইন্টারনেটের প্রভাব মানুষের ওপর আরও খারাপ হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ এমনভাবে যুক্ত থাকার জন্য তৈরি নয়। আমি ইন্টারনেট থেকেই জীবিকা নির্বাহ করি, কিন্তু এটি কেবল কাজ সহজ করার একটি মাধ্যম। পুরো জীবনকে ইনস্টাগ্রামের চোখে দেখার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
বুয়েনস আইরেসের আইনজীবী মারিয়ানো হেলার এক্সে লিখেছিলেন, ‘আইলাভপিডিএফ কীভাবে বিনামূল্যের টুল হতে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়। চাকা, এয়ার কন্ডিশনার ও পেনিসিলিনের পর এটি হয়তো ইতিহাসের অন্যতম সেরা আবিষ্কার।’ তবে এ ধরনের প্রশংসাকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের জন্য একটি কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য সেবা বজায় রাখাকেই জীবনের বড় লক্ষ্য মনে করেন এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।
তথ্যসূত্র : এল পাইস, আইলাভপিডিএফের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, লা ভ্যানগার্দিয়া ও ভিয়া এমপ্রেসা





