ব্যাপক ক্ষতির মুখে খুচরা বিনিয়োগকারীরা
বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, চীনের মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের শেয়ারবাজারে মোট বাজারমূল্যের ৪২ শতাংশ এবং লেনদেনের ৫৭ শতাংশই ছিল এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারের দখলে। এই বাজারে সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। প্রযুক্তি এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেইজিং সাধারণ মানুষকে শেয়ারবাজারে আকৃষ্ট করতে চাইলেও সাম্প্রতিক এই ধসের সরাসরি শিকার হয়েছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।
হার্ডওয়্যার ও চিপ নির্মাতাদের শেয়ারে বড় পতন
প্রযুক্তি হার্ডওয়্যার ও রোবোটিকস খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোবট নির্মাতা ইউনিট্রি বাজারে আসার পর থেকেই শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশ কমে গেছে। চিপ নির্মাতা মেটাক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস এবং মুর থ্রেডসের শেয়ারের দাম গত জুলাইয়ের পর প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। তাছাড়াও অন্যতম শীর্ষ চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটির শেয়ারদর গত এক মাসে কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে মার্কিন ডেটা সেন্টারে অপটিক্যাল যন্ত্রাংশ সরবরাহে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার খবরে ঝংজি ইনোলাইট ও ইওপটোলিংকের শেয়ারদর শীর্ষ অবস্থান থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
মডেল ল্যাব ও ওপেন সোর্সের মূল্যযুদ্ধ
হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি চীনের এআই মডেল গবেষণাগারগুলোও তীব্র ধাক্কা খেয়েছে। হংকংয়ের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠান মিনিম্যাক্স এবং ঝিপু (জেড.এআই) তাদের সর্বোচ্চ বাজারমূল্য থেকে মোট ১৫ হাজার কোটি ডলার হারিয়েছে। গত ২২ অক্টোবর মিনিম্যাক্সের শেয়ারদর প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) চেয়েও নিচে নেমে যায়। অন্যদিকে ঝিপুর শেয়ারদর জুন মাসের তুলনায় কমেছে ৮১ শতাংশ। ওপেন সোর্স মডেলের দ্রুত বিস্তারের কারণে এই পতন আরও তীব্র হয়েছে। ডিপসিক এবং পরবর্তীতে মুনশট এআই তাদের উন্নত মডেলগুলো বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত করায় সেবা বিক্রির ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্যিক সক্ষমতা ভেঙে পড়ে।
ধসের নেপথ্য কারণ ও বিদেশি পুঁজির বহির্গমন
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে শেয়ারের মাত্রাতিরিক্ত মূল্যায়ন, সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রকৃত বাণিজ্যিক চাহিদার ঘাটতিই এই ধসের মূল কারণ। স্টার৫০ সূচকের শেয়ারের গড় মূল্য আয় অনুপাত (পি/ই রেশিও) এক সময় ২৫০-এর কাছাকাছি পৌঁছালেও ধসের পর তা নেমে এসেছে ১০০-তে। এর পাশাপাশি বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের তহবিল প্রত্যাহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে হংকং ট্রেডিং লিংকের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার বা ৯ হাজার কোটি ইউয়ান সমমূল্যের বিদেশি তহবিল বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে, যা এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফান্ড ম্যানেজার ডং বাওঝেন জানান, এই খাতের র্যালি একটি ফটকাবাজি উন্মাদনায় রূপ নিয়েছিল এবং এখন সেই ফাঁপা ভিত্তির বিস্ফোরণ ঘটছে।
অব্যবহৃত ডেটা সেন্টার ও বৈশ্বিক প্রভাব
চীনে বড় অবকাঠামো গড়ে তোলা হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতার কারণে অনেক নতুন এআই ডেটা সেন্টারই অলস পড়ে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এনভিডিয়ার উন্নত চিপ রপ্তানিতে মার্কিন বিধিনিষেধ। যদিও স্থানীয় শূন্যতা পূরণে হুয়াওয়েই চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে বৈশ্বিক বাজারেও এআই অবকাঠামো নির্মাণের বিশাল খরচ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও আমাজনের মতো মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো ২০২৬ সালে এআই অবকাঠামো তৈরিতে সম্মিলিতভাবে শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রাখায় পুরো প্রযুক্তি খাত এক ধরনের আর্থিক চাপে রয়েছে। অন্যদিকে আগামী জানুয়ারি মাসে ঝিপু ও মিনিম্যাক্সের উদ্যোক্তাদের হাতে থাকা বিপুল শেয়ার বাজারে আসার সুযোগ তৈরি হওয়ায় চীনের প্রযুক্তি খাতে এই মূল্যযুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।





