এপস্টিন নথি প্রকাশ নিয়ে অসন্তোষ: অ্যাটর্নি জেনারেলকে পদচ্যুত করলেন ট্রাম্প

পাম বন্ডি
পাম বন্ডি | ছবি: রয়টার্স
0

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে পদচ্যুত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন সংক্রান্ত নথি প্রকাশ নিয়ে তার কাজের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ থেকেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে জানান, উপ-অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ সাময়িকভাবে বিচার বিভাগের দায়িত্ব নেবেন। ব্লাঞ্চ ট্রাম্পের সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী। ওই পোস্টে ট্রাম্প বন্ডিকে ‘গ্রেট আমেরিকান প্যাট্রিয়ট অ্যান্ড আ লয়াল ফ্রেন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি অপরাধ দমনে ব্যাপক অভিযান তদারক করেছেন।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘বন্ডি শিগগিরই বেসরকারি খাতে যোগ দেবেন।’ তবে এখনো তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ডি লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত করতে ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত সফল প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দেয়াটা জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান।’ তিনি আরও লেখেন, আগামী এক মাসে তিনি দায়িত্ব ব্লাঞ্চের কাছে হস্তান্তর করবেন। পরে ব্লাঞ্চ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান এবং বন্ডির প্রশংসা করে বলেন, ‘আমেরিকাকে নিরাপদ রাখতে আমাদের সামর্থ্যের সবটুকু করবো।’

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বকালে বন্ডি ট্রাম্পের এজেন্ডার কঠোর সমর্থক ছিলেন। তার আমলে বিচার বিভাগ তদন্তে হোয়াইট হাউসের দীর্ঘদিনের স্বাধীনতার রীতি থেকে সরে আসে। তবে এপস্টিন নথি প্রকাশকে ঘিরে বারবার সমালোচনাই তার মেয়াদে প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজন ও কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা বন্ডির বিরুদ্ধে এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশে গোপনীয়তা বা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলেন। এপস্টিন ছিলেন এমন এক অর্থায়নকারী, যিনি ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন।

মামলাটির বিষয়ে অবগত এক সূত্র জানায়, গত বুধবার হোয়াইট হাউসে বৈঠকে ট্রাম্প বন্ডিকে বলেন, ‘তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে তার বিকল্প খুঁজছেন।’ ওই সূত্রের মতে, সাম্প্রতিক দিনে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা তাকে বন্ডিকে বরখাস্ত করতে উৎসাহিত করছিলেন।

একজন জ্যেষ্ঠ হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক মাসে ট্রাম্প একাধিকবার বন্ডির কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার প্রশাসক লি জেলডিনকে বন্ডির স্থলাভিষিক্ত করার কথাও ভেবেছেন, তবে অন্য নাম নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

গত বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে দিনভর ছিলেন বন্ডি। সকালে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে যান, পরে ইস্টার মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন এবং রাতে ইরান-যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের জাতির উদ্দেশে ভাষণও দেখেন। সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্প উপস্থিত ছিলেন, যখন বন্ডির শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন সলিসিটার জেনারেল ডি. জন সাউয়ার বিচারপতিদের প্রশ্নের মুখে পড়েন। বিষয়টি ছিল জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার প্রশাসনের প্রচেষ্টা।

আরও পড়ুন:

এপস্টিন নথি ট্রাম্পের জন্য নতুন করে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করে এবং এপস্টিনের সঙ্গে তার পুরোনো বন্ধুত্ব নিয়ে আবারও প্রশ্ন তোলে। ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, ওই সম্পর্ক বহু দশক আগে শেষ হয়ে গেছে।

বন্ডির বরখাস্ত বিচার বিভাগে কৌশলগত পরিবর্তন আনতে পারে এবং ট্রাম্পের লক্ষ্যবস্তুদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আইনব্যবস্থা আরও জোরালোভাবে ব্যবহারের নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বরখাস্ত হওয়া দ্বিতীয় শীর্ষ ট্রাম্প প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেন বন্ডি। ৫ মার্চ সমালোচনার মুখে ট্রাম্প স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা সচিব ক্রিস্টি নোএমকেও সরিয়ে দেন।

ফ্লোরিডার সাবেক রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল বন্ডি বলেছিলেন, ‘তিনি বিচার বিভাগের সহিংস অপরাধ দমনে ফিরিয়ে আনতে এবং ট্রাম্পের সমর্থকদের আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্প ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ে ফেডারেল প্রসিকিউটররা দুইবার তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছিল।’

বন্ডির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ছিল, ট্রাম্পের বিরোধী তদন্তে কাজ করা বহু পেশাদার প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সমালোচকরা জানায়, তিনি বিচার বিভাগের ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষ ন্যায়বিচারের নীতি থেকে সরে গেছেন। বিচার বিভাগের সাবেক আইনজীবী স্ট্যাসি ইয়াং বলেন, ‘পাম বন্ডি বিচার বিভাগ ও এর কর্মীবাহিনীর ওপর হাতুড়ির আঘাত হেনেছিলেন।’

বন্ডির আমলে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইউনিট থেকে অভিজ্ঞ আইনজীবীরা সরে যান এবং বিচার বিভাগ প্রায় পুরোপুরি ট্রাম্পের সুরে চলতে থাকে। এখন ওয়াশিংটনের সদর দপ্তরে ট্রাম্পের ছবি শোভা পাচ্ছে।

বিচার বিভাগ ট্রাম্পবিরোধীদের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত চালিয়েছে। এর মধ্যে গত বছর সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি এবং নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়। তবে আদালতে এসব মামলা বাধার মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বিচারক তা খারিজ করে দেন। বিচারক রায় দেন, ট্রাম্প মনোনীত প্রসিকিউটর লিন্ডসি হ্যালিগ্যানকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট বিচারবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ডিক ডারবিন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্বার্থে বিশ্বের শীর্ষ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মধ্যেই পাম বন্ডির উত্তরাধিকার সীমাবদ্ধ থাকবে, তবে মনে হচ্ছে ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে তিনিও যথেষ্ট দূর এগোতে পারেননি।’

এএম