মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ (ওএফএসি) গত শুক্রবার এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ইরান সরকারকে অর্থ দেওয়া সাধারণত নিষিদ্ধ। তবে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিও যদি ইরানকে এই মাসুল প্রদান করে, তবে তারাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়বে। ওএফএসি বলেছে, ইরানি বন্দরগুলোতে জাহাজ নোঙর করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌ-পরিবহন খাতের অংশীজনরা একাধিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করেছে ইরান। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান এই অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তেহরান দাবি করেছে, জাহাজগুলোকে নিরাপদে ও অবাধে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে তারা এই টোল আদায় করছে।
ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদেজা হাজি বাবাবেই গত সপ্তাহে দাবি করেছেন, টোল থেকে সংগৃহীত আয়ের প্রথম অংশ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে টোলের পরিমাণ বা কারা এই অর্থ দিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। বিবিসিও স্বতন্ত্রভাবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
ওএফএসি জানিয়েছে, টোল বা মাসুল আদায়ের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ ছাড়াও ডিজিটাল সম্পদ, অফসেট কিংবা অনানুষ্ঠানিক সোয়াপ ব্যবহার করা হতে পারে। এমনকি ইরানি দূতাবাসে দেওয়া দান বা অন্য কোনো উপায়ে দেওয়া অর্থও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ইরানের আয়ের প্রধান উৎসগুলো, বিশেষ করে পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর তারা কঠোর নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রাখবে। গত শুক্রবারই ইরানের তেল বিক্রির অর্থ রূপান্তরের অভিযোগে তিনটি বিদেশি মানি এক্সচেঞ্জ হাউসের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘ইরান সরকারের অর্থ উপার্জন ও তা স্থানান্তরের সক্ষমতা নষ্ট করতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাব। যারা তেহরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করছে, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে তেহরান। ইতিমধ্যে তারা দুটি জাহাজ জব্দও করেছে। অন্যদিকে ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে ইরানি বন্দরগুলোতে কোনো জাহাজ প্রবেশ বা বের হতে পারছে না। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, এই অবরোধের ফলে ইরানের টোল ও তেল বিক্রির আয় বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাদের ওপর চাপ বাড়বে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অবরোধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৫টি পণ্যবাহী জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার জাহাজ চলাচল করলেও বর্তমানে তা দিনে হাতেগোনা কয়েকটিতে নেমে এসেছে। তেল, খাদ্য ও ওষুধ পরিবহনের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, নৌপথ বন্ধ থাকায় ত্রাণ পরিবহনে বিকল্প ও দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ত্রাণ কার্যক্রম আরও বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে সুদানের মতো দেশে ত্রাণ পৌঁছানোর খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে এবং সময় লাগছে অন্তত ২৫ দিন বেশি।
অন্যদিকে গত ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে পাকিস্তান মারফত ইরান একটি প্রস্তাব পাঠালেও তাতে ইতিবাচক সাড়া দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা একটি চুক্তি করতে চায়, কিন্তু আমি এতে তেমন আগ্রহী নই। দেখা যাক কী হয়।’ ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘তারা এমন সব দাবি করছে যা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরুতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মুজতবা খামেনি স্থলাভিষিক্ত হন। তবে বর্তমানে দেশটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আগের মতো কেন্দ্রীভূত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানজুড়ে হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দাবি, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে, যদিও তেহরান শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।





