ট্রমার বৃত্তে ইসরাইল: গভীর হচ্ছে যুদ্ধের মানসিক ক্ষত

ইসরাইলি সেনাবাহিনী
ইসরাইলি সেনাবাহিনী | ছবি: সংগৃহীত
0

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অবিরাম বোমাবর্ষণ আর সংঘাত—যার মধ্যে রয়েছে গাজায় ইসরাইলের চালানো গণহত্যা, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা এবং এর জের ধরে ইরান, লেবানন ও সিরিয়াসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইসরাইলের একের পর এক সামরিক অভিযান।

সব মিলিয়ে পুরো ইসরাইলি সমাজ এখন এক গভীর ট্রমা বা মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পর্যবেক্ষক এবং খোদ ইসরাইলের একাধিক গবেষণায় এ চিত্র ফুটে উঠেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।

ম্যাকাবি হেলথকেয়ার সার্ভিসেসের সাম্প্রতিক এক জরিপের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি তিনজন ইসরাইলির মধ্যে একজন মনে করেন যে তাদের পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজন। আর যারা সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক বা রিজার্ভিস্ট (সংরক্ষিত) সেনা হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।

গত জানুয়ারিতে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে সেনাদের মধ্যে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ (পিটিএসডি) বা যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক তীব্র উত্তেজনার ঘটনা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে এই হার ১৮০ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও, এ সময় মানসিক স্বাস্থ্যজনিত কারণে কতজন সেনাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করেনি দেশটির সরকার; যা নিয়ে ইসরাইলি গণমাধ্যমে সমালোচনা চলছে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে, ইসরাইলের জরুরি চিকিৎসা সেবা সংস্থা ‘মাগেন ডেভিড অ্যাডাম’ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি ডেডিকেটেড জরুরি হটলাইন চালু করতে বাধ্য হয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, মানসিক সহায়তার জন্য আসা কলের সংখ্যা হঠাৎ ৪৫ শতাংশ বেড়ে গেছে, যার বড় কারণ একের পর এক যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক চাপ।

মানসিক স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান নির্দেশক হলো আত্মহত্যার হার, যা বর্তমানে ইসরাইলি সমাজে আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর মধ্যে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। গত ফেব্রুয়ারিতে ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ইসরাইলি সেনাদের আত্মহত্যা ঘটনার ৭৮ শতাংশেরই সরাসরি সংযোগ রয়েছে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং লেবাননে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সঙ্গে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ অন্তহীন যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইলে পারিবারিক সহিংসতা, বিষণ্ণতা এবং চরম মানসিক অবসাদের মতো সমস্যাগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

এমনকি ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও গত মে মাসের শেষের দিকে এ সামাজিক অবক্ষয়ের কথা স্বীকার করেছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর উগ্র ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে ক্রমবর্ধমান হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে হারজগ বলেন, ‘আজ আমি কেবল ঐক্যের কথা বলতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের চমৎকার ইসরাইলি সমাজের প্রান্তিক স্তরে এক ভয়াবহ নৃশংসতার প্রক্রিয়া দানা বাঁধছে। এটি একটি ধীর কিন্তু চরম উদ্বেগজনক প্রক্রিয়া, যা ইসরাইলি সমাজের মূল স্রোতে ঢুকে পড়ার হুমকি তৈরি করছে। আমরা এটি কোনোভাবেই হতে দিতে পারি না।’

ইসরাইলের প্রবীণ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক সেনা সদস্য তুলি ফ্লিন্ট আল জাজিরাকে বলেন, ‘৭ অক্টোবর যেন একটা সুইচের মতো কাজ করেছে, যা পুরো সমাজে এক দীর্ঘস্থায়ী ট্রমার জন্ম দিয়েছে। মানুষের নিরাপত্তার বোধ পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।’

তিনি মনে করেন, অতীতের সীমিত সংঘাত এবং বর্তমান যুদ্ধের মধ্যকার ব্যবধান ইসরাইলিদের মনে এক ধরনের মিথ্যা সুরক্ষাবোধ তৈরি করেছিল। ইসরাইলের সামরিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ওপর অতি-আত্মবিশ্বাস ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো ‘দখলদারিত্ব ও নিপীড়ন’ থেকে তাদের এতদিন এক নিরাপদ দূরত্বে রেখেছিল, যা এখন ভেস্তে গেছে।

ফ্লিন্ট আরও বলেন, ‘মানুষ এখন তাদের সমাজ, সরকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।’

রাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর ভরসা রাখা নাগরিকরা এখন চরম প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার বোধ করছেন। তিনি বলেন, ‘এ ক্ষোভের কারণে অনেকে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছেন, যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে আরও বেশি সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন এবং সরকারের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন।’ এবং এ প্রবণতা থামার কোনো লক্ষণ নেই।

চলতি বছরের শুরুতে ‘এন১২’ নিউজ সাইটের একটি জরিপও এই দাবির সত্যতা প্রমাণ করে। গাজা গণহত্যা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের আবহে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সী প্রথমবার ভোট দেওয়া ইহুদি ইসরাইলিদের ৪৬ শতাংশ মনে করে, ৭ অক্টোবরের ঘটনা মূলত ‘ভেতর থেকে আসা বিশ্বাসঘাতকতা’র ফল। এ জরিপটি দেখায় যে, বর্তমান তরুণ প্রজন্মই ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে ডানপন্থী এবং উগ্র ধর্মীয় ভাবাপন্ন।

তবে বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই সহিংসতার ধারা কেবল ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে—এমনটা ভাবা ভুল হবে। প্রখ্যাত ইসরাইলি সমাজবিজ্ঞানী ইহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি আল জাজিরাকে বলেন, ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরাইলের ডিএনএ-তে সহিংসতা মিশে আছে; ৭ অক্টোবরের ঘটনা কেবল সেই পুরনো ধারাকে নতুন গতি দিয়েছে।

শেনহাভ-শাহরাবানি বলেন, "মানুষ অতীতের ট্রমা মুছে ফেলার জন্য নতুন একটি ‘শুরুর তারিখ’ খোঁজে। ৭ অক্টোবরকে একটি প্রারম্ভিক বিন্দু হিসেবে ধরে নেওয়াটা বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার একটা অজুহাত মাত্র।’

তার প্রয়াত বন্ধু ও লেবাননের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ইলিয়াস খুরির একটি বক্তব্য স্মরণ করে শেনহাভ-শাহরাবানি বলেন, ‘খুরি মনে করতেন ইসরাইলিদের অহংকার কমতে এবং আরও মানবিক হতে হলে একবার পরাজয়ের স্বাদ পাওয়া দরকার।’

কিন্তু শাহরাবানি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই যে তেমন কিছু ঘটেছে। ৭ অক্টোবর একটি পরাজয় ছিল ঠিকই, কিন্তু এরপর থেকে ইসরাইলিরা আরও বেশি ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘জায়নবাদের মধ্যে সবসময়ই একটা ফ্যাসিবাদী উপাদান ছিল, যা কিবুতজিমের মতো উদারপন্থী ধারা দিয়ে ঢাকা থাকত। কিন্তু ৭ অক্টোবরের পর সেই মুখোশ পুরোপুরি খুলে গেছে। এটা এখন সর্বত্র দৃশ্যমান।’ কট্টর ডানপন্থী শিক্ষার্থীদের ক্রমাগত বিরোধিতার মুখে শাহরাবানি নিজেই এখন শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়েছেন।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাহাভা সলোমন, যিনি গত ৪০ বছর ধরে এ ট্রমা নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি মনে করেন বর্তমান ট্রমা ইসরাইলকে ভবিষ্যতে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা এখনও অস্পষ্ট।

তার মতে, ট্রমা একটি সমাজকে হয় আরও শক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে, অথবা আলোচনার মাধ্যমে শান্তি খোঁজার পথে চালিত করতে পারে। তবে ইসরাইলের ক্ষেত্রে, ‘হলোকস্ট’ বা ইহুদি নিধনের অতীত ট্রমা তাদের মনে এক চিরস্থায়ী ‘ভিকটিম কমপ্লেক্স’ বা নিপীড়িত হওয়ার মানসিকতা তৈরি করেছে, যা প্রতিটি নাগরিকের মজ্জাগত। তাদের কাছে ‘আর কখনো নয়’ নীতিটি এক চরম সত্য।

এর বিপরীতে ফিলিস্তিনিরাও দশকের পর দশক ধরে নিজস্ব নিপীড়নের শিকার। ফলে, দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী মনস্তত্ত্বের ভবিষ্যৎ পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রের ফ্রন্টলাইনে ট্রমা ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করা ফ্লিন্টের মতে, এ সংকটের কোনো সহজ সমাধান নেই। তার ভাষায় ‘এর কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই। কেবল কিছুটা সামলে নেওয়া সম্ভব। মানুষ যখন একবার এ মানসিক আঘাতের সীমা পার হয়ে যায়, তখন আর পেছনে ফেরার পথ থাকে না।’

এএইচ