চুক্তিতে সই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের, যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয়

তেহরানের রাস্তা
তেহরানের রাস্তা | ছবি: সংগৃহীত
0

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই তথ্য জানালেও চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া উভয় দেশই জানিয়েছে, একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য আরও আলোচনা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি নিয়ে নানা সংশয় তৈরি হয়েছে। জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার পর সেখানে আস্থা ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে এবং অনেক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মাধ্যমে গত এপ্রিলে ঘোষিত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকে তেহরান কার্যত এই প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ৬০ দিনের এই সময়সীমার মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা করবেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধের পক্ষে যে দুটি কারণ দেখিয়েছিলেন—আঞ্চলিক সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে লাগাম টানা—তা এই আলোচনায় থাকছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্সে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প বলেন, ‘চুক্তিটি সম্পূর্ণ সই হয়েছে।’ তিনি জানান, শুক্রবার জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অংশ নেবেন।

ইরান ও ওমানের মধ্যকার সরু জলপথ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার ফলে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। চুক্তির খবরে গত ১০ মার্চের পর সোমবার তেলের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। তবে মঙ্গলবার এশীয় বাণিজ্যে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ৯৬ ডলারে স্থির হয়, যা বাজারের সতর্ক অবস্থানের প্রতিফলন। এই সংঘাত নিরসনে চুক্তিটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই যুদ্ধে মূলত ইরান ও লেবাননে অন্তত ৭ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার চরম অস্থিরতার মুখে পড়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তি যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’, তবে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তি ‘এখনো রূপ নেয়নি’। অন্যদিকে সিএনএনকে জেডি ভ্যান্স বলেন, সই হওয়া সমঝোতা স্মারকটি একটি ‘খুবই সাধারণ দলিল’। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী দুই দিনের মধ্যে এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।

ভ্যান্স জানান, এতে ইরানের জন্য একটি ‘খুবই তাৎপর্যপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার প্যাকেজ’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরে তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, ট্রাম্প হয়তো শুক্রবারের আগেই এই চুক্তি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই চুক্তির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের মাধ্যমে ইরান উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। এই তহবিলের অর্থায়ন করবে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব সুবিধা পেতে হলে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার মার্কিন দাবি মেনে নিতে হবে এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়া বন্ধ করতে হবে। তবে পরমাণু অস্ত্র তৈরির ইচ্ছার কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসা ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে পুনরায় কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করার মাধ্যমে তারা খুব বেশি ছাড় দেননি।

এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে পারে। তবে জাহাজ পরিচালনাকারীরা বলছেন, কেবল নিরাপদ পারাপারের বিষয়ে নিশ্চিত হলেই তারা পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু করবেন। জাপানের শিপিং জায়ান্ট মিৎসুই ওএসকে লাইনসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তামুরা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ‘বাস্তব’ না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চালাবেন না। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতার আলোকে আমার মনে হয়, এতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ বা এক মাস সময় লাগতে পারে।’ ট্রাম্পের চুক্তি ঘোষণার পরও তার এই অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ওমানের সঙ্গে মিলে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রণালিটি ৬০ দিনের জন্য শুল্কমুক্ত থাকবে এবং তারা প্রত্যাশা করে যে চূড়ান্ত চুক্তিতে এই বিধানটি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, তেলবাহী জাহাজগুলো প্রণালি থেকে বের হতে শুরু করেছে এবং দক্ষিণের ‘মহাসড়ক’ দিয়ে যাচ্ছে, যা ‘সম্পূর্ণ নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং অক্ষত’।

এদিকে মার্কিন মিত্র ইসরাইল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ চুক্তির পথে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবাননে এই সংঘাতে ইতিমধ্যে ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইরান বলেছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সেখানে সব ধরনের বৈরিতা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। তবে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে তাদের বাহিনী মোতায়েন রাখবে এবং হিজবুল্লাহর যেকোনো হামলার জবাব দেয়ার অধিকার ধরে রাখবে। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ইরান চেয়েছিল আমরা সেখান থেকে সরে আসি, কিন্তু আমি আমার অবস্থানে অনড় ছিলাম।’ ইসরাইল ইরানের সঙ্গে এই শান্তি আলোচনায় সরাসরি অংশ নেয়নি।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্চে হিজবুল্লাহ যুদ্ধে যোগ দেয়ার পর লেবাননে যে আগ্রাসন শুরু হয়েছিল, সেখান থেকে ইসরাইলের সেনা প্রত্যাহার এই চুক্তির কোনো শর্ত নয়। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইসরাইলি হামলা অবশ্যই অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

এএম