ট্রাম্পের আমলে মার্কিন ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে মৃত্যুহার দ্বিগুণ: রয়টার্সের বিশ্লেষণ

ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) বন্দিদের বহনকারী একটি বাস
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) বন্দিদের বহনকারী একটি বাস | ছবি: রয়টার্স
0

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) বা ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে বন্দিদের মৃত্যুর হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে প্রতি ৩ হাজার ৮৪৮ জন বন্দির মধ্যে বছরে গড়ে একজন মারা যেতেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের গণ-বহিষ্কার অভিযান শুরুর পর, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী এ হার বেড়ে প্রতি ১ হাজার ৬৩০ জনে একজনে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এ পর্যন্ত ৫০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এই মৃত্যুর কারণগুলো জটিল হলেও আইসিই রেকর্ড এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পর্যালোচনা করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার এবং অন্যান্য তথ্য বন্দিশালাগুলোতে নজরদারি ও চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। ডেমোক্র্যাট জো বাইডেনের শেষ বছরে বন্দিসংখ্যা বাড়তে শুরু করলেও ট্রাম্পের আমলে তা অনেক বেশি বেড়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতা নেয়ার সময় প্রায় ৪০ হাজার অভিবাসী বন্দি ছিলেন। পরে জানুয়ারিতে তা সর্বোচ্চ ৭০ হাজারে পৌঁছায় এবং জুনের শুরুতে তা কমে ৫৭ হাজারে দাঁড়ায়।

রয়টার্সের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, ৫০ জন মৃতের মধ্যে ২১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় তাদের মারা যাওয়ার পর বা অচৈতন্য অবস্থায়। এর মধ্যে ১০টি আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে, যা মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নজরদারির অভাব এবং সময়মতো চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার প্রমাণ হতে পারে বলে মনে করছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী চিকিৎসক সঞ্জয় বসু। অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে, যা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করে।

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক শ্যানেল ডিয়াজ বলেন, ‘এই তথ্য প্রমাণ করে যে সংস্থাটি চিকিৎসাগতভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের বন্দি করছে, যার ফলে ‘‘প্রতিরোধ্য মৃত্যুর হার’’ বাড়ছে।’ যেমন—গত সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কের একটি বন্দিশালায় সান্তোস রেয়েস বানেগাস নামের এক হন্ডুরান নাগরিক অ্যালকোহল প্রত্যাহারের (উইথড্রয়াল) কারণে সৃষ্ট কাঁপুনি নিয়ে মারা যান। চিকিৎসকরা তার অবস্থা জানলেও তাকে কোনো জরুরি বিভাগে পাঠানো হয়নি।

ইন্ডিয়ানার একটি ডিটেনশন সেন্টারে (যাকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘স্পিডওয়ে স্ল্যামার’ বলে ডাকে) গত এপ্রিলে তুয়ান ভ্যান বুই নামের ৫৫ বছর বয়সী এক ভিয়েতনামি নাগরিক স্ট্রোক ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সহবন্দিদের দাবি, তিনি পড়ে যাওয়ার পর রক্ষীদের ডাকলেও তারা আসতে ১৫ মিনিট সময় নেন। চিকিৎসা কর্মীরা আরও ১০ মিনিট পর পৌঁছান, কিন্তু ততক্ষণে বুই মারা যান। যদিও কেন্দ্রীয় নিয়ম অনুযায়ী ৪ মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানোর কথা।

পেনসিলভানিয়ার মোশানন ভ্যালি প্রসেসিং সেন্টারে গত আগস্টে চিনা অভিবাসী কাওফেং গে (৩২) আত্মঘাতী হন। আইসিই দাবি করেছে, তার মানসিক সমস্যার কোনো রেকর্ড তাদের কাছে ছিল না। অথচ এর আগে অন্য একটি কারাগারে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং চিকিৎসকরা তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের নতুন নীতির কারণে অনেক কম গুরুতর অপরাধীও এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বন্দি হচ্ছেন। যেমন আফগান বিশেষ বাহিনীর সাবেক সদস্য মোহাম্মদ পাকতিয়াওয়াল, যিনি ২০২১ সালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। সামান্য কেনাকাটায় দুর্নীতির দায়ে তাকে আটক করা হয় এবং পরে তিনি হৃদরোগে মারা যান। আইসিই তার মৃত্যুর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাকে ‘অপরাধী অবৈধ এলিয়েন’ হিসেবে উল্লেখ করে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের একটি নতুন ধারা।

এএম