গত শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা বেড়ে ৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত মাসের তুলনায় তা ৩ পয়েন্ট বেশি। উল্লেখ্য, গত মাসে তার জনপ্রিয়তার হার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সর্বনিম্ন হারের সমান ছিল।
এই সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যের কথা বলেছেন। কখনো তিনি বলেছেন, ইরানের জনগণকে তাদের নেতৃত্বকে উৎখাত করতে সাহায্য করা এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য। কখনো বলেছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ধ্বংস করা তার লক্ষ্য। আবার কখনো বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই মূল উদ্দেশ্য। জরিপে দেখা গেছে, ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক—যাদের মধ্যে ১০ জনে ৪ জনই রিপাবলিকান দলের সমর্থক—মনে করেন, ‘ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের লক্ষ্যগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে’ ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেছেন, ‘পরিবর্তনশীল জনমত জরিপের’ ওপর ভিত্তি করে ট্রাম্প কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। তিনি জানান, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের অবস্থান অনড়। ওয়েলস আরও বলেন, ‘মার্কিন জনগণের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একজন সেনাপ্রধান পাওয়া, যিনি তাদের নিরাপদ রাখতে সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারেন।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা শুরু করার পর থেকেই এই সংঘাতের প্রতি জনসমর্থন কখনো ৪০ শতাংশ ছাড়ায়নি। যা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অন্যান্য সংঘাতের প্রাথমিক অবস্থার থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। গ্যালাপের জরিপ অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চলা ইরাক যুদ্ধের প্রাথমিক মাসগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের সমর্থন ছিল। ২০০১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত চলা আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রথম দিকে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ যুদ্ধকে সমর্থন করেছিল।
‘কেন যুদ্ধে জড়িয়েছি, তার কারণ জানি না’
আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ নিয়ে জনরোষ ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের ওপর চাপ তৈরি করেছে। কংগ্রেসে অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখার লড়াই এখন তাদের সামনে।
জর্জিয়ার স্টকব্রিজের বাসিন্দা অ্যালেক্স ওম্যাক পেশায় একজন অবসরপ্রাপ্ত টারবাইন মেরামতকারী। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হয়েই তিনি রিপাবলিকান দলে যোগ দিয়েছিলেন। ওই যুদ্ধে মার্কিন মেরিন কোরের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। তবে বর্তমান সংঘাত নিয়ে তার অবস্থান ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘আমরা কেন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলাম, তা স্পষ্ট নয়। আমার কোনো ধারণা নেই।’ এই যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের প্রতি তার সমর্থন কমে গেছে বলেও জানান তিনি। ওম্যাক বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না তিনি খুব ভালো করছেন।’
এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ইরান এবং লেবাননে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। লেবাননে ইরান-সমর্থিত যোদ্ধারা ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে, যা অনেক আমেরিকানের জন্যই বড় আঘাত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম গড়ে গ্যালনপ্রতি প্রায় ৩ ডলার ছিল, যা এখন বেড়ে ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যালেক্স কনান্ট বলেন, ‘এটি নানাভাবে দলের ওপর চাপ তৈরি করছে এবং সবগুলোই নেতিবাচক। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানুয়ারি থেকেই বলে আসছেন যে তাদের অর্থনৈতিক যুক্তিতে জিততে হবে। কিন্তু আপনি যখন স্পষ্টতই পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন, তখন অর্থনৈতিক যুক্তিতে জেতা কঠিন।’
সর্বশেষ রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে দেখা গেছে, নিরপেক্ষ ভোটাররা কংগ্রেসের নির্বাচনে ৩৬ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ ব্যবধানে রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে রাখছেন। অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদেরই সমর্থন দিচ্ছেন।
যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলেন ট্রাম্প
২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণার সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি অনুমান করেছিলেন, ইরান যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলবে। ২০ বছর ধরে চলা এবং ৫৮ হাজারের বেশি মার্কিন সেনার প্রাণ কেড়ে নেয়া ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ অন্যান্য যুদ্ধের সঙ্গে বর্তমান সংঘাতের তুলনা করলে তিনি চরম বিরক্তি প্রকাশ করেন।
জর্জিয়ার ফেয়ারবার্নের বাসিন্দা রিয়ান অ্যান্ডারসন একজন নিরপেক্ষ ভোটার। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি ট্রাম্পকেই ভোট দিয়েছিলেন। তার মতে, ইসরাইল বা অন্যান্য মিত্রকে সাহায্য করার পরিবর্তে ট্রাম্পের উচিত দেশের ভেতরের সমস্যাগুলোতে মনোযোগ দেয়া। নিরাপত্তা ও ডেটা সংগ্রহের কাজ করা অ্যান্ডারসন ২০২০ সালে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনকে ভোট দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যারা আসলে দেশের ভেতরে আছেন, তাদের প্রতি মনোযোগ দেয়া। আমি জানি আমাদের মিত্র আছে, কিন্তু এখানে অনেক মানুষ রয়েছেন যাদের সত্যিই সাহায্য দরকার।’
মার্চের মাঝামাঝি থেকে রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে ইরানে সামরিক হামলা তারা সমর্থন করেন কি না, তা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। ওই সময় ৩৭ শতাংশ যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন সমর্থনের হার ছিল ২৭ শতাংশ। সেই জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অনিশ্চয়তা প্রকাশের সুযোগও দেয়া হয়েছিল, যা ২৯ শতাংশ মানুষ বেছে নিয়েছিলেন।
সর্বশেষ এই রয়টার্স/ইপসোসের জরিপটি অনলাইনে দেশজুড়ে পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ১ হাজার ২৪৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকের মতামত নেয়া হয়েছে এবং জরিপে ত্রুটির সীমা উভয় দিকে ৩ শতাংশ পয়েন্ট।





