ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, তেহরান সৌদি আরব, কাতারসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আরব মিত্রদের জানিয়েছে, তারা যেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে হামলা বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে ফেরাতে উদ্যোগ নেয়।
ইরানের সতর্কবার্তায় তেলক্ষেত্র, শোধনাগার, বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্প ২৮ জুলাই ইরানের জ্বালানি খাত ও অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেয়ার পর এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দুই ইরানি কর্মকর্তা, দুই উপসাগরীয় সূত্র এবং একজন আঞ্চলিক কূটনীতিক রয়টার্সকে জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আঞ্চলিক কূটনীতিক বলেন, আরাকচি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে ট্রাম্পের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নতুন হামলা ঠেকানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। তবে কূটনৈতিক সমাধানই বৃহত্তর সংঘাত ও ধ্বংস এড়ানোর সবচেয়ে ভালো পথ।’ এক উপসাগরীয় সূত্র বলেন, ‘ইরানের সতর্কবার্তা ছিল স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত করা হবে।’
সৌদি আরবের কূটনৈতিক উদ্যোগ
ইরানের এই বার্তার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রেখে আলোচনা, যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। এক উপসাগরীয় সূত্র জানায়, ইরানের সতর্কবার্তা সব উপসাগরীয় দেশের জন্য ছিল। তবে তা মূলত সৌদি আরব ও কাতারের মাধ্যমে পৌঁছানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছে। কাতার, ওমান ও সৌদি আরবও ওয়াশিংটনকে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর আহ্বান জানিয়েছে। দ্বিতীয় ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ইরান সতর্ক করেছে, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলে পুরো অঞ্চল ‘আগুনের গোলায়’ পরিণত হতে পারে। গত ২ আগস্ট ট্রাম্প বলেন, দ্রুত একটি চুক্তি করতে পারলে ইরানে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করা যেতে পারে।
আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
এক উপসাগরীয় সূত্র বলেন, সৌদি আরব মনে করে, সংঘাত বাড়লে শুধু ধ্বংসই বাড়বে। তাই দেশটি কূটনীতিকে সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, নিজেদের ভূখণ্ডে হামলা হলে তারা সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাবে। সৌদি বিশ্লেষক আলি শিহাবি বলেন, রিয়াদের ধারণা, সংঘাত বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সমন্বয়ই সমাধানের পথ হতে পারে।
ইরানের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। ইরানের কর্মকর্তা ২০১৯ সালের সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উদাহরণ টেনে বলেন, উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতা তেহরানের জানা আছে। তিনি বলেন, ‘শত্রু যদি ইরানের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে ইরান আরও বড় ক্ষতি করবে।’
ইরানের দৃষ্টিতে এখন ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ রয়েছে—উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন সংঘাত বাড়ানো অথবা এমন একটি সমঝোতায় যাওয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত বিজয়ের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। আঞ্চলিক কূটনীতিকের মতে, চুক্তির অন্যতম বড় বাধা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ফলাফল চায় যা তারা নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারে।





