রেকর্ড শস্য মজুত, নতুন রপ্তানিকারক; এল নিনোর ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি

রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলে গম কাটছে একটি কম্বাইন হারভেস্টার
রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলে গম কাটছে একটি কম্বাইন হারভেস্টার | ছবি: রয়টার্স
0

কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘সুপার’ এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থা। প্রায় রেকর্ড পরিমাণ শস্য মজুত, উন্নত প্রযুক্তি এবং ব্রাজিল ও রাশিয়ার মতো নতুন বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোর উত্থানের ফলে অতীতের তুলনায় এবারের বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা অনেক বেশি সহনশীল।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, ১৯৮০-র দশক থেকে বিশ্বের কৃষি উৎপাদন ভোগ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত হারে বেড়েছে। উচ্চ ফলনশীল শস্যের জাত, বেশি সার ব্যবহার এবং উন্নত সেচ ও ফসল সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে ধান, গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। অস্ট্রেলিয়ার কৃষি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান এপিসোড ৩-এর অ্যান্ড্রু হোয়াইটল বলেন, ‘খরার সময়েও উন্নত সেচ ব্যবস্থাপনা ও কৃষি বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা বাজারযোগ্য ফলন পাচ্ছি।’ রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এল নিনোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব
এল নিনোর কারণে সৃষ্ট শুষ্কতা ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফসল রোপণকে ব্যাহত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সার ও ডিজেলের ঘাটতি, যা বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ভারত ইতোমধ্যে বৃষ্টিহীন বর্ষা মৌসুমের সঙ্গে লড়াই করছে। অস্ট্রেলিয়ার গম উৎপাদন অঞ্চলে খরার আশঙ্কা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফসলগুলোতেও আর্দ্রতার অভাব দেখা দিয়েছে।

মার্কিন আবহাওয়াবিদ ক্রিস হাইড জানিয়েছেন, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিক এবং আগামী বছরের শুরুতে এই এল নিনো আরও তীব্র হবে। এটি হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো। ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের ভয়াবহ এল নিনোর সময় ব্রাজিল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে খরায় চিনি ও পাম অয়েলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল।

রেকর্ড মজুত ও নতুন কৌশল
এবার প্রায় রেকর্ড পরিমাণ শস্য মজুত, খরাসহনশীল বীজ, উন্নত আবহাওয়ার পূর্বাভাস, প্রিসিশন এগ্রিকালচার এবং নতুন রপ্তানিকারক দেশের উত্থান বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে বিশ্বকে রক্ষা করবে। মুম্বাইয়ের ফিলিপ ক্যাপিটাল ইন্ডিয়ার কমোডিটিস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট অশ্বিনি বনসোদ জানিয়েছেন, ভারতে প্রাথমিক বিলম্ব সত্ত্বেও ফসল বপন মোটামুটি ঠিকঠাক এগোচ্ছে।

বিশ্বের চাল রপ্তানির ৪০ শতাংশের উৎস ভারত এখন এত চাল মজুত করেছে যে সংরক্ষণাগারে জায়গা পাচ্ছে না। এই মজুত বিশ্বের এক বছরের মোট চাল রপ্তানির চেয়েও বেশি। অন্যদিকে বিশ্বের গমের প্রায় অর্ধেক মজুত রয়েছে চীনের হাতে। বৈশ্বিক পাম অয়েলের মজুতও ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।

নতুন রপ্তানিকারক ব্রাজিল ও রাশিয়া
কয়েক দশক আগেও যেসব দেশ কৃষি বাজারে খুব একটা ছিল না, তারা এখন বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখছে। ব্রাজিল এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সয়াবিন সরবরাহকারী। ১৯৯৭-৯৮ সালের তুলনায় দেশটির সয়াবিন রপ্তানি বেড়েছে ১৩ গুণেরও বেশি। রাশিয়ার গম রপ্তানি একই সময়ে ১০ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪ কোটি ৮০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশে খরাসহনশীল ভুট্টার হাইব্রিড জাত ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে।

ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায় তাপ ও খরাসহনশীল গমের জাতও জনপ্রিয় হয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কম সময়ে ফলনশীল ধানের জাত অনিয়মিত বর্ষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে সাহায্য করছে। কৃষকরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর পরামর্শ, স্যাটেলাইটভিত্তিক ফসল পর্যবেক্ষণ, উচ্চ-রেজল্যুশনের মাটি আর্দ্রতা মানচিত্র এবং জিপিএস-নির্ভর সার প্রয়োগের মতো ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।

এফএও-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো রয়টার্সকে বলেন, ‘সরকারগুলো এখন অতীতের চেয়ে অনেক ভালো তথ্য পাচ্ছে এবং আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে পারছে।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি কেমন হয় তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে, বিশেষত হরমুজ প্রণালি সংকটের কারণে সারের বাড়তি দাম ও কৃষি উপকরণ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হতো হরমুজ প্রণালি দিয়ে।

এএম