মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করছে কানাডা; আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় সম্পর্কের চরম অবনতি

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি | ছবি: রয়টার্স
0

যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর গতকাল (শনিবার, ২২ আগস্ট) কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার জবাবেই এই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই পাল্টা শুল্কের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্য থাকবে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতা ও বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত শুক্রবার রাতে দুই দেশের মধ্যকার নিবিড় আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেঙে যায়। আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে দুই দেশ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটির ভবিষ্যৎ জটিল হয়ে পড়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের আওতায় রয়েছে কানাডার ওয়াইন, আসবাব, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, মাছ ধরার বড়শি ও হকি খেলার সরঞ্জাম। এর মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার। ত্রিদেশীয় বাণিজ্য চুক্তির অধীনেও কানাডীয় পণ্যগুলো এই শুল্কের আওতামুক্ত থাকছে না, যা গত ১৮ মাস ধরে কানাডার রপ্তানিকে সুরক্ষা দিচ্ছিল।

আক্রান্ত হলে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়

এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, ‘কানাডার শ্রমিক, কৃষক, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে ওয়াশিংটনের নতুন শুল্কের বিপরীতে সমান হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে।’ বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলো কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত হলে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমরা আক্রান্ত হয়েছি।’

মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হাতে গোনা বিশ্বনেতাদের একজন কার্নি। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও তিনি নতুন বাণিজ্য ও সামরিক জোট গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এই আলোচনা ভেঙে যাওয়াকে কানাডার জন্য একটি হাতছাড়া হওয়া সুযোগ বলে অভিহিত করেছেন। ‘ফক্স নিউজ’–কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কানাডার পাল্টা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আমরা কাজ শুরু করছি। তারা সব সময় সেরা সুবিধা পেয়ে আসছিল এবং আরও ভালো সুবিধা পেতে পারত, কিন্তু তারা তা চায়নি।’

এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস, মার্কিন বাণিজ্য সচিবের কার্যালয় বা বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। কার্নি ওটাওয়ার পার্লামেন্ট ভবন থেকে জানান, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি সরঞ্জাম, কৃষি যন্ত্রপাতি, মণ্ড ও কাগজ এবং ইলেকট্রনিকস পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করবে। আগামী দিনগুলোতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে। কার্নি বলেন, ‘তারা যা প্রস্তাব করেছে, তা আমরা মেনে নিতে পারি না। আর তারা যা চেয়েছে, তা আমরা দেব না।’

কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্যান্ডিস লেং বলেন, ‘খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় আমরা সব অঞ্চলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করছি।’ ওন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড কার্নির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, ‘তিনি যে এই চুক্তিতে সই করেননি, তাতে আমি খুশি। এটি ওন্টারিও, গাড়ি ও ইস্পাত খাতের জন্য একটি খারাপ চুক্তি ছিল।’

বিরোধের নেপথ্যে বড় গাড়ি

আলোচনার প্রধান বিরোধপূর্ণ বিষয়ের একটি ছিল মাঝারি ও ভারী ট্রাকের শুল্ক সুবিধা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কানাডা মাঝারি ও ভারী ট্রাকের ক্ষেত্রেও হালকা যানবাহনের মতো সুবিধাজনক শুল্ক সুবিধা চেয়েছিল, যার বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র। কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে কানাডায় তৈরি ফোর্ডের এফ-৩৫০, এফ-৪৫০, এফ-৫৫০ এবং জেনারেল মোটরসের সিলভেরাডোর মতো মডেলগুলো শুল্কমুক্ত সুবিধা থেকে বাদ পড়তো। এতে কানাডার উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমে যেত।

কার্নি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন কিছু প্রস্তাব ছিল যা কানাডার সংস্কৃতি, ভাষা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করত। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের কারণে কার্নি কানাডায় বেশ জনপ্রিয়। দেশটির বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়ের পোয়ালিভার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়ের ওপর এই অন্যায্য আক্রমণের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষায় সব কানাডীয়কে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

এএম