চীন-নেপাল সীমান্তে হ্রদ ভাঙার শঙ্কা কমছে; উদ্ধার তৎপরতা চালানোর সুযোগ

ভূমিধসের পর সৃষ্ট ব্যারিয়ার লেকের ড্রোনচিত্র
ভূমিধসের পর সৃষ্ট ব্যারিয়ার লেকের ড্রোনচিত্র | ছবি: রয়টার্স
0

চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদটি আকারে ছোট হয়ে আসায় তা ভেঙে প্লাবনের আশঙ্কা কমেছে। শনিবার চীনের কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ওই এলাকায় ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিব্বত ও নেপাল সীমান্তের দুই নদীর সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা হ্রদটির পানি ধীরে ধীরে বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে সেখানে পানির চাপ কমেছে। শনিবার বিকেল নাগাদ হ্রদটির তলদেশের কিছু অংশ দৃশ্যমান হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানায়, পুরেপু সাংপো নদীর ওপর সৃষ্ট এই হ্রদটি শনিবার সকালে ৯৯ হাজার বর্গমিটার এলাকায় বিস্তৃত ছিল, যা বৃহস্পতিবারের চেয়ে ২১ হাজার বর্গমিটার কম।

গত বুধবার হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট পাথর, বরফ ও কাদার তীব্র স্রোত হিমালয়ের নদীগুলোতে আছড়ে পড়ে। এতে তিব্বতের সঙ্গে নেপালকে সংযোগকারী একটি সীমান্ত বন্দর ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এ ঘটনায় শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছিলেন, উপত্যকায় দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে হিমবাহের ধ্বংসাবশেষের কারণে সৃষ্ট হ্রদটি ভেঙে পড়লে ভাটি অঞ্চলে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হতে পারত।

হ্রদের পানি স্বাভাবিক নিয়মে কমে আসায় ভাটি অঞ্চলে উদ্ধারকাজ এখন নিরাপদে চালানো যাবে বলে মনে করছেন চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ঝুঁকি কেটে যাবে। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে উদ্ধারকর্মীদের ৩০ মিনিট আগেই সতর্ক করা সম্ভব হবে।

চীনের রাষ্ট্রীয় উদ্ধার ও প্রকৌশল সংস্থা চায়না আননেং হ্রদটির ওপর ২৪ ঘণ্টা ড্রোন ও রাডার দিয়ে নজরদারি চালাচ্ছে। শুক্রবার হ্রদের পানি উপচে পড়ার কারণে সাময়িকভাবে উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখা হলেও পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে হিমবাহ ধসের পাদদেশে আরেকটি বড় জলাশয় চিহ্নিত করেছে কর্তৃপক্ষ। চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগ কারিগরি নির্দেশনা কেন্দ্রের সিনিয়র প্রকৌশলী চেন হোংকি বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, এর আয়তন ১ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটারের বেশি। তবে এর গভীরতা এখনো জানা যায়নি।’ নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, দুটি হ্রদের পানি পুরোপুরি নিষ্কাশিত না হওয়া পর্যন্ত বন্যার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

শনিবার সকালে বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যেই ৫০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী কাদা ও পাথরের স্তূপের মধ্যে জীবিতদের খোঁজে তল্লাশি চালিয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে প্রথম উদ্ধারকারী দল ও অনুসন্ধানকারী কুকুর জিরং সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রে পৌঁছায়। তবে পুরো এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, মূল দুর্ঘটনাকবলিত এলাকার বিপজ্জনক পরিস্থিতি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। আগামী তিন দিন ওই এলাকায় থেমে থেমে বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সীমান্ত বন্দরে যাওয়ার প্রধান মহাসড়কটি সচল করতে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা। শনিবার বিকেল নাগাদ তারা দুর্ঘটনাস্থলের দেড় কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছেছেন। চীনে এ পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এখনো ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এলাকাটি থেকে প্রায় ৫০০ গ্রামবাসী, নির্মাণশ্রমিক এবং ৫৫৫ জন পর্যটককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

হিমবাহ ধসের সঠিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে এর জন্য dায়ী করছেন। হংকং সিটি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের ডিন বেনজামিন হর্টন বলেন, ‘এটি কোনো ভূমিকম্পের কারণে নাকি তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বরফ গলে হয়েছে, তা আমরা এখনো নিশ্চিত নই।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ও রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, লাংতাং লিরুং পর্বতচূড়ার কাছাকাছি হিমবাহের নিচের অংশটি ভেঙে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে তুষারধস ও ভূমিধসের সৃষ্টি করেছে। বেনজামিন হর্টন আরও বলেন, ‘ভূমিধসের পেছনের কারণগুলো আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারছি না পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে। তাই বিজ্ঞান ও সমাজ গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’

এএম