ধার করা ১৩ ডলার, পায়ে হাঁটা পথ
পঞ্চাশোর্ধ্ব তালকা সাদার পকেটে এখন মাত্র ২,০০০ নেপালি রুপি। বাংলাদেশি টাকায় যা হাজার টাকারও কম, ডলারে ১৩। এই টাকা তিনি ধার করেছেন। প্রতি ১০০ রুপিতে ২০ রুপি সুদ দিতে হবে। এই সম্বল নিয়ে ভাইকে সঙ্গী করে সপ্তারী থেকে ২৯২ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কাঠমান্ডু পৌঁছেছেন। বাসে লেগেছে নয় ঘণ্টা। কাঠমান্ডুতে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেছেন। মর্গের বাইরে ঝোলানো মরদেহের ছবিগুলো দেখেছেন। বেশির ভাগ মরদেহই পচে গিয়েছে, চেনার উপায় নেই। কোথাও বিনোদের নাম নেই, ছবি নেই।
পাহাড়ে পাহাড়ে হাঁটা
হাসপাতালে খোঁজ না পেয়ে তালকা পায়ে হেঁটে রওনা হয়েছেন নুওয়াকোটের দিকে। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার। ভাঙা সড়ক, কাদা আর ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে ত্রিশুলী শহরে পৌঁছেছেন। বাজারের ওপর পুরু কাদার আস্তরণ। রাতে একটি লজে মাথা গোঁজার জন্য গুনতে হয়েছে ১,৫০০ রুপি। বিনিময়ে পেয়েছেন এক মুঠো ভাত, যাতে ক্ষুধাও মেটেনি। তালকা বলেন, ‘আর একটা রাত এখানে থাকলে হাতে কিছুই থাকবে না। বাড়ি ফেরার পথটুকুর টাকাও থাকবে না।’
‘আমাদের দূরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে’
তালকা সাদা নেপালের তরাই অঞ্চলের মধেশি সম্প্রদায়ের মানুষ। আরও নির্দিষ্ট করে বললে মুসাহার গোষ্ঠীর, যারা নেপাল ও ভারতের বিহার-উত্তরপ্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় বাস করে এবং চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটায়। তালকার অভিযোগ, জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাকে সাহায্য করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব। তারা আমাদের মধেশি আর বিহারি ভাবে। আমরা নেপালি ভাষায় ভালো কথা বলতে পারি না, তাই সবাই আমাদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে। একটা মরদেহ দেখার অধিকারও কি আমাদের নেই? থানা থেকে সেনা ক্যাম্প, সব জায়গায় নাম লিখিয়েছি। কেউ সাহায্য করছে না।’ নেপালি কর্তৃপক্ষ বলছে, ১,০০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ও হাজার হাজার নিখোঁজের এই দুর্যোগে তারা সবাইকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে।
আশা ও হতাশার দোলাচল
তালকা বারবার ছেলের ফোন নম্বরে ডায়াল করেন। ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসে না। তিনি বলেন, ‘ছেলের গলা শুনতে পাচ্ছি না। বাড়িতে সবাই ভেঙে পড়েছে। আমার স্ত্রী বলেছে, ছেলেকে ফিরিয়ে আনো।’
এক মুহূর্তে আশা জাগে তার চোখে। ‘আমার ছেলে তরুণ। সে দিনমজুর, শরীরে শক্তি আছে। হয়তো কোথাও হেঁটে গিয়ে বেঁচে আছে।’ পরমুহূর্তেই সেই আশা মিলিয়ে যায়। ‘আমার আর কোনো আশা নেই। বেঁচে থাকলে একবার ফোন করতো। পানি খেতে গেলেও একটা মিসড কল দিতো।’
তবু থামছেন না। ভাইকে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করেছেন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে, যেখানে বিনোদ কাজ করতো। যাওয়ার আগে হতাশায় চিৎকার করে বলেন, ‘কেউ যদি সাহায্য না করে, থানায় আগুন লাগাতে হবে।’
নেপালের পাহাড়ে এখনো হাজার হাজার পরিবার তালকা সাদার মতোই অপেক্ষায়। কারও ছেলে, কারও মেয়ে, কারও স্বামী নিখোঁজ। আর তালকার মতো বাবারা ধার করা কয়েকটা টাকা পকেটে নিয়ে ভাঙা রাস্তায় হাঁটছেন, একটু খবরের আশায়।
—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে





