ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ; সহিংসতা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা

শিক্ষার্থীদের মিছিলে দৌড়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা
শিক্ষার্থীদের মিছিলে দৌড়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা | ছবি: সংগৃহীত
0

জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ শনিবার ফ্রান্সে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। এতে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন, নাগরিক সমাজ ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের কর্মীদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সারা দেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে ফরাসি প্রশাসন। ইউরো নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

আজ সকালে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মার্সেইতে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্থানে ময়লার ঝুড়ি ও বিদ্যুৎচালিত স্কুটারে আগুন ধরিয়ে দিলে দাঙ্গা পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করে। এদিকে ভাঙচুর ও লুটপাটের আশঙ্কায় সারা দেশের বিভিন্ন শহরের বিপণিবিতানগুলোর সামনে কাঠের পাটাতন দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আজ সারা দেশে প্রায় ৫০০ ধরনের কর্মসূচি ও অন্তত ৯০টি বিক্ষোভ সমাবেশ হতে পারে। রাজধানী প্যারিসসহ বড় শহরগুলোতে সহিংসতার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ পরিবেশ নিয়ে গত চার সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ এ দেশব্যাপী কর্মসূচি ডাকা হল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্র ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজকে জানায়, উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে এবং বিক্ষোভের নির্ধারিত পথ ভাঙার চেষ্টা করতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন রুট ও জরুরি অবকাঠামো অবরোধ কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না।

এদিকে গতকাল শুক্রবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভের অধিকারকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বিক্ষোভের অধিকার পুরোপুরি সংরক্ষিত, তবে এর পাশাপাশি মানুষ ও সম্পত্তির প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে। তাই আমি সবাইকে শান্ত ও শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে ফরাসি পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্র চোখ হারিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আরেকটি ঘটনায় পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেড মাটি থেকে তোলার সময় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে। ওই ঘটনার পর নির্দিষ্ট কিছু স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল ফ্রান্স।

তবে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বিক্ষোভে মারাত্মক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হবে। গত মঙ্গলবার ফরাসি সিনেটকে তিনি জানান, শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনায় ৩৬টি তদন্ত শুরু হয়েছে। এর মধ্যে চারটি অঙ্গহানি ও ছয়টি গুরুতর জখমের অভিযোগ রয়েছে।

ফ্রান্সে আজকের এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে সময় জ্বালানি ও ডিজেলের ওপর কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে মাসের পর মাস রাজপথ ও তেল শোধনাগার অবরোধ করা হয়েছিল। বর্তমানে দেশটির সরকার তীব্র ঋণসংকটে রয়েছে এবং একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টে ব্যয়সংকোচন বাজেট পাসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান ল্যাকরনু জানান, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৯৩৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। এছাড়া ২৪৮ জন শিক্ষার্থী ও ১৪৯ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন, যা দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রেকর্ডে সর্বোচ্চ। তিনি সতর্ক করে বলেন, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এখন ‘শহুরে সহিংসতায়’ রূপ নিচ্ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ পুলিশ ইউনিয়ন অ্যালায়েন্স পুলিশ ন্যাশনাল সরকারের বিরুদ্ধে অন্যদের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে। ইউনিয়নটি অভিযোগ করেছে, পুলিশ সদস্যদের পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে এবং তাদের সহিংসতার মুখে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে।

এদিকে কট্টর বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবাউডের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে দলটির নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ জানিয়েছেন, তিনি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পক্ষে।

এএম