সহিংসতার মাত্রা কতটা তীব্র?
ফ্রান্সে নিয়মিত বিক্ষোভ ও ধর্মঘট সাধারণ ঘটনা হলেও সম্প্রতি রাজপথের সহিংসতার রূপ ফরাসি নাগরিকদেরও হতবাক করেছে। দোকানপাটে অবাধে হামলা, লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে প্রধান শহরগুলোতে। এর আগে ২০১৮ সালে দেশটিতে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ ভেস্ট আন্দোলন টানা কয়েক মাস ধরে চলেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সেই আন্দোলনকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বিক্ষোভের সূচনা কীভাবে?
গত ১৭ অক্টোবর মূলত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে নতুন করে হলুদ ভেস্ট আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়। ২০১৮ সালে যখন প্রথম বিক্ষোভ হয়, তখন প্রতি লিটার আনলেডেড পেট্রোলের দাম ছিল ১ দশমিক ৫৩ ইউরো এবং ডিজেল ছিল ১ দশমিক ৪৭ ইউরো। বর্তমানে পেট্রোল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২০ ইউরো এবং ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ২ দশমিক ৩০ ইউরোতে। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও অপর্যাপ্ত বেতনের কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দ্রুত রাজপথে আছড়ে পড়ে। স্পেনের মতো জ্বালানির শুল্ক কমানোর দাবি জানানো হলেও ফরাসি সরকার জানিয়েছে, বড় অঙ্কের সরকারি ঋণের কারণে শুল্ক কমানো সম্ভব নয়।
স্কুলশিক্ষার্থীরা কেন রাজপথে নামলো?
জ্বালানি তেলের অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চবিদ্যালয় বা লিসির শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, যা গত সেপ্টেম্বর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দানা বাঁধছিল। জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের করুণ দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে শিক্ষার্থীরা নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়।
প্যারিসের দরিদ্র শহরতলি সাঁ-দেনির পল এলুয়ার্দ লিসিতে শ্রেণিকক্ষের মেঝে দিয়ে ইঁদুর দৌড়ানোর ভিডিও দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অন্যদিকে মঁপেলিয়ের কাছে সাঁ-ক্লেমঁ-দ্য-রিভিয়েরের জঁ জরেস লিসির খাবার ঘরের ছাদ ধসে পড়ার দৃশ্য প্রকাশ্যে আসে। শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায় ক্লাসরুমে ককরোচের উপদ্রব, ভাঙা পানির কল, বন্ধ না হওয়া টয়লেটের দরজা এবং তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও সিলগালা হয়ে থাকা জানালা। এমনকি কিছু স্কুলে সাবান ও টয়লেট পেপারের মতো মৌলিক সুবিধাও ছিল না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, অযৌক্তিক সময়সূচি ও দীর্ঘ ক্লাসের ক্লান্তি।
পরিসংখ্যানে শিক্ষার কী চিত্র মিলছে?
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচি (পিসা)-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সে ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শিক্ষক অনুপস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারের হিসাবেও শিক্ষক সংকটে প্রায় ১০ শতাংশ ক্লাস নষ্ট হচ্ছে।
পিসার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফ্রান্সের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দুর্বল ভবন, খেলার মাঠের অভাব এবং ত্রুটিপূর্ণ হিটিং, কুলিং ও লাইটিং ব্যবস্থার কারণে। দেশটির সরকার ২০২৩ সালে স্বীকার করে যে মোট স্কুল ভবনের প্রায় ১০ শতাংশ মারাত্মক জরাজীর্ণ। এর বড় কারণ হলো, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্ধেকই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে তৈরি।
বরাদ্দ বেশি হলেও সংকট কাটছে না কেন?
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) জানিয়েছে, ফ্রান্সে শিক্ষা খাতে মোটেই বরাদ্দের সংকট নেই। ২০২৩ সালে ফ্রান্সের সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করেছে, যা উন্নত দেশগুলোর গড় বরাদ্দের (৪ শতাংশ) চেয়ে বেশি। সাধারণ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার বছরে গড়ে ১৬ হাজার ৬৭৪ ডলার ব্যয় করে, যেখানে উন্নত দেশগুলোর গড় ১২ হাজার ৪২১ ডলার।
ফরাসি শিক্ষার্থীরা বছরে গড়ে ১ হাজার ৮ ঘণ্টা ক্লাসে অংশ নেয়, যা জার্মানিতে ৯০০ ঘণ্টা এবং যুক্তরাজ্যে ৬৪০ ঘণ্টা। তবে পিসার মূল্যায়নে বিজ্ঞান, গণিত ও পাঠদক্ষতায় ফ্রান্সের অবস্থান যুক্তরাজ্যেরও নিচে।
অর্থের অপচয় ও মূল কারণ কী?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাত্রাতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শিক্ষা খাতের ব্যয় আকাশচুম্বী হচ্ছে। বিদ্যালয় ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ করে স্থানীয় কাউন্সিল, আর পাঠ্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব কোনো স্বাধীনতা থাকে না। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের সমান জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্সে প্রায় দ্বিগুণসংখ্যক স্কুল থাকায় ব্যবস্থাপনা খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়।
আরেকটি বড় সংকট হলো শিক্ষকদের পেনশনের পেছনে বিপুল খরচ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৮৭ বিলিয়ন ইউরো বাজেটের মধ্যে ২৪ বিলিয়ন ইউরোই চলে যায় শিক্ষকদের পেনশনে সরকারের অবদান হিসেবে। বিশ্লেষকদের মতে, পুরো ফরাসি কাঠামোটি তরুণদের চেয়ে প্রবীণদের স্বার্থ সুরক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, যার মাশুল দিচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
—দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে অবলম্বনে





