বরং প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর ফলে নেতানিয়াহু সেই বিশেষ ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন, যার অজুহাত দেখিয়ে বেশ কয়েকটি দেশ এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা এড়িয়ে গেছে। এর ফলে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের পথ যেমন সুগম হবে, তেমনই বিদেশি আদালতগুলোতেও তিনি ব্যক্তিগত ফৌজদারি বিচারের ঝুঁকিতে পড়বেন। গাজায় যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ক্ষুধাকে ব্যবহার, হত্যা ও নিপীড়নসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আইসিসি।
আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির ৫৮(৪) ধারা অনুযায়ী, আদালত নিজে থেকে কোনো পরোয়ানা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তা পুরোপুরি কার্যকর থাকে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নুজহাত শামীম খান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে আদালত এই পরোয়ানা প্রত্যাহারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এই পরোয়ানা জারি হয়েছে প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পর্যালোচনার ভিত্তিতে, যা তিনি ক্ষমতায় না থাকলেও বহাল থাকবে। তবে নেতানিয়াহুর অনুপস্থিতিতে বিচার শুরু করা সম্ভব নয়; বিচার পরিচালনার জন্য তাকে গ্রেপ্তার করে নেদারল্যান্ডসের হেগে আদালতের কাছে হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক। ইসরাইল এখনও আদালতের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করে দুটি আপিল ঝুলিয়ে রেখেছে, তবে আদালত পরোয়ানা স্থগিত করেনি।
ব্যক্তিগত দায়মুক্তি ও আন্তর্জাতিক রীতির অবসান
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ক্ষমতায় থাকাকালীন বিদেশি আদালতের বিচার ও গ্রেপ্তার থেকে ব্যক্তিগত দায়মুক্তি উপভোগ করেন। তবে এই সুরক্ষা সম্পূর্ণ অস্থায়ী এবং পদ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বাতিল হয়ে যায়। সাবেক নেতাদের ক্ষেত্রে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্রে সীমিত দায়মুক্তি প্রযোজ্য হলেও যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।
ফ্রান্স, ইতালি ও হাঙ্গেরির মতো কয়েকটি দেশ অতীতে নেতানিয়াহুর এই শীর্ষ পদের দায়মুক্তির কথা উল্লেখ করে তাকে গ্রেপ্তারে অনীহা দেখিয়েছিল। ক্ষমতা ছাড়লে নেতানিয়াহু সেই প্রাথমিক কূটনৈতিক সুরক্ষাটি হারাবেন। তবে আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী না থাকায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহায়তার ওপরই তাদের নির্ভর করতে হবে। পরবর্তী ইসরাইলি সরকার যদি নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, তবে তারা চাইলে নেতানিয়াহুকে হেগের আদালতের হাতে তুলেও দিতে পারে।
বিদেশি আদালতে মামলার ঝুঁকি
পদ হারানোর পর বিভিন্ন দেশের জাতীয় আদালতেও নেতানিয়াহুর বিচারের মুখোমুখি হওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। বিশ্বের বহু দেশে ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন বা বৈশ্বিক বিচারিক এখতিয়ারের আওতায় যেকোনো স্থানে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিধান রয়েছে। যেমন গাজাগামী ত্রাণবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় তুরস্কের আদালতে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। ব্যক্তিগত দায়মুক্তি উঠে গেলে এমন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা অনেক সহজ হবে। এর আগে চিলির সাবেক স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোশে কিংবা সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মামলার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অপরাধে দায়মুক্তি প্রযোজ্য নয় বলে নজির স্থাপন করেছিলেন আদালত। ফলে গ্রেপ্তার এড়াতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে পারেন নেতানিয়াহু।
আইসিজেতে গণহত্যার মামলা ও ঘরোয়া বিচার
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলাটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। তাই প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ফলে এই মামলায় কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে নেতানিয়াহুর অতীত বক্তব্য ও সামরিক নির্দেশনাই এই মামলায় গণহত্যার প্রমাণের বড় দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তাছাড়াও প্রধানমন্ত্রিত্ব হারালেও ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ আদালতেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলা ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের তিনটি দুর্নীতির বিচার বন্ধ হবে না। ২০২০ সাল থেকে চলতে থাকা এই মামলায় তিনি দোষ স্বীকার না করেই প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করেছিলেন। তবে বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদসহ বিরোধী শিবির স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দোষ স্বীকার করে রাজনীতি থেকে আজীবন অবসর না নিলে নেতানিয়াহুকে কোনো ক্ষমা মঞ্জুর করা যাবে না।





