তারাভানু বোরহানউদ্দিন উপজেলার ছোট মানিকা গ্রামের বাসিন্দা এবং বাহার উদ্দিনের স্ত্রী। তিনি স্বামীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ এনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন।
ভোলা কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক শেখ মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘বুধবার মামলাটির শুনানির তারিখ ছিল। আদালতের কার্যক্রম চলাকালে বাদী তারাভানু এজলাসে দাঁড়িয়ে ব্যাগ থেকে তরল জাতীয় একটি পদার্থ বের করে পান করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে আদালতে উপস্থিত ব্যক্তিরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।’
আদালত সূত্র ও উপস্থিত আইনজীবীরা জানান, মামলাটির চার্জ গঠনের বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এসময় বিচারক মামলার এক নম্বর আসামি বাহার উদ্দিনকে মামলায় রেখে অপর দুই আসামিকে অব্যাহতি দেন। তবে আদালতের আদেশ ভুল বুঝে তারাভানু মনে করেন, তার স্বামীকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এতে হতাশ হয়ে তিনি এজলাসেই বিষপান করেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহের জামালপুরের মেয়ে তারাভানু প্রায় ১৪ বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ছোট মানিকা গ্রামের কাভার্ড ভ্যানচালক বাহার উদ্দিনকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
সংসারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে তারাভানু সৌদি আরব ও পরে কাতারে প্রায় পাঁচ বছর প্রবাসজীবন কাটান। এসময়ে উপার্জিত অর্থ স্বামীর কাছে পাঠাতেন। ২০২৩ সালে দেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার পাঠানো অর্থ দিয়ে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এ নিয়ে পারিবারিক বিরোধের সৃষ্টি হয়।
পরিবারের দাবি, দেশে ফেরার পর দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেয়ার বিষয়ে কথা বললে বিভিন্ন সময় তারাভানুর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এক পর্যায় তারাভানুকে তালাক দেয়ার কথা বললে স্বামীর বাড়ি ছোট মানিকায় তার ওপর হামলা করে।
আরও পড়ুন:
সবশেষ ২০২৫ সালে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটলে তিনি স্বামী বাহারের দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথী, দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মিসির খাঁ ও মা নুর নাহারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আজ মামলার রায়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা ও মাকে আদালত অব্যহতী প্রদান করেন।
ভোলা বারের আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি আকর্ষিক ঘটনা। মামলার শুনানি ছিলো। তারাভানু ও তার স্বামী বাহার উদ্দিনের মধ্যে চলমান পারিবারিক মামলার শুনানি আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির এক পর্যায়ে বাহার উদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা-মায়ের জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। বিষয়টি তারাভানু সঠিকভাবে বুঝতে না পেরে বা আবেগপ্রবণ হয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে এসিড পান করেন বলে জানা গেছে।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে এবং আদালতের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগও ছিল। এমন ঘটনা আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করার পাশাপাশি একটি বিব্রতকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করে।’
ঘটনাটি আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টিকেও নতুন করে সামনে এনেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আদালত এলাকায় নিরাপত্তা ও তল্লাশি ব্যবস্থার বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
ভোলা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘তারাভানু নামে এক নারী বিচারপ্রার্থী আদালতে এসে এসিড পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এ ধরনের ঘটনা আদালতের পরিবেশ ও বিচারব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আদালত প্রাঙ্গণে এসিডের মতো বিপজ্জনক পদার্থ নিয়ে প্রবেশ করা সম্ভব হওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও ছিল। এতে বিচারক, আইনজীবী, আদালতকর্মী ও বিচারপ্রার্থীরা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারতেন।’
তিনি বলেন, ‘আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এতে বিচারক, আইনজীবী, আদালতকর্মী ও বিচারপ্রার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা ও বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ পাবেন।’
ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ জুনায়েদ হোসেন বলেন, ‘তাকে দ্রুত হাসপাতালে এনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।’




