প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে এসব অপপ্রচার সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।’ নির্বাচন শেষে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে বলেও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘কে কী বললো, তাতে কিছু আসে যায় না। ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে—এর এক দিন আগেও নয়, পরেও নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ; পুরো প্রক্রিয়া উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করা হবে।’
তিনি জানান, নির্বাচনকালে অন্তর্বর্তী সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে। প্রশাসন হবে পক্ষপাতহীন এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
আলবার্ট গম্বিস (সাবেক অ্যাক্টিং আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট) ও মরস ট্যান (সাবেক অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ) আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ সফর করছেন।
প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে নির্বাচন, জুলাই বিপ্লব ও তার পরবর্তী পরিস্থিতি, তরুণ আন্দোলনকারীদের উত্থান, জুলাই সনদ ও গণভোট, নির্বাচনকেন্দ্রিক ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার, রোহিঙ্গা সংকট এবং জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে সত্য ও পুনর্মিলনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তার মতে, জনগণের সমর্থনে গৃহীত হলে জুলাই সনদ দেশে গণতান্ত্রিক শাসনের নতুন অধ্যায় সূচিত করবে এবং ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের কোনো সুযোগ থাকবে না।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘সাবেক স্বৈরাচারী শাসনের সমর্থকেরা নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির উদ্দেশ্যে ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়াচ্ছে। তবে জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং ক্রমেই এআই-নির্ভর ভুয়া ভিডিওসহ মিথ্যা প্রচারণা শনাক্ত করতে পারছে।’
সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি গম্বিস বলেন, ‘ভুয়া খবর বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের অন্যতম বড় শত্রু হয়ে উঠেছে।’ এ বিষয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
দুই মার্কিন কূটনীতিকই গত দেড় বছরে দেশ পরিচালনায় প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকার প্রশংসা করেন। তারা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ-পরবর্তী ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’র মতো উদ্যোগ বাংলাদেশে সম্ভব কি না—সে প্রশ্নও তোলেন।
জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘নেলসন ম্যান্ডেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সত্য ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়া গভীরভাবে অনুসরণ করেছেন।’ তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে এমন উদ্যোগের সময় আসেনি বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘এখন সময় ঠিক নয়। কোথা থেকে শুরু করবেন? সত্য ও পুনর্মিলন তখনই সম্ভব, যখন কেউ নিজের ভুল স্বীকার করবে, অনুশোচনা ও অনুতাপ প্রকাশ করবে এবং উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত তরুণদের বিষয়ে সাবেক শাসকগোষ্ঠী এখনো অস্বীকারের রাজনীতি করছে। তারা দাবি করছে, তরুণরা সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছে। অথচ তাদের অপরাধের বিপুল প্রমাণ রয়েছে—নির্মম ও বর্বর অপরাধ। তবু কোনো অনুশোচনা বা স্বীকারোক্তি নেই।’
নির্বাচনে ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় জাতিসংঘের সহায়তা চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা
এদিকে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের সহায়তা চেয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস। এ বিষয়ে মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন তিনি।
আলোচনায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে ভুয়া তথ্যের একধরনের বন্যা তৈরি হয়েছে। বিদেশি গণমাধ্যমের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকেও এসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ, গুজব ও অনুমানের বিস্তার নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জবাবে ভলকার তুর্ক বলেন, ‘বিষয়টি তার নজরে এসেছে। ভুয়া তথ্যের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘ভুয়া তথ্যের পরিমাণ অনেক। এ সমস্যা মোকাবিলায় যা করা প্রয়োজন, আমরা তা করব।’ এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আশ্বাস দেন তিনি।
আরও পড়ুন:
টেলিফোনালাপে দুই পক্ষ আসন্ন গণভোট, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গুরুত্ব, গুম সংক্রান্ত কমিশনের কার্যক্রম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) গঠন এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন।
ভলকার তুর্ক গুম সংক্রান্ত বিষয়গুলোর অনুসন্ধান জোরদার করতে একটি বাস্তব অর্থে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। জবাবে অধ্যাপক ইউনূস জানান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এরইমধ্যে জারি করা হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেই নতুন কমিশন পুনর্গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যাওয়ার আগেই এটি করব।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, তিনি গুম-সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কাছে হস্তান্তর করেছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বৈরশাসনামলে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এ প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এসময় ভলকার তুর্ক গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টার নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও জাতিসংঘের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন। টেলিফোনালাপের সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।





