সাদা রঙে ফুটপাত দখল: রাজধানীর সড়ক কি হকারদের হাতেই যাচ্ছে?

সাদা দাগে জায়গা করে দেয়া হচ্ছে হকারদের
সাদা দাগে জায়গা করে দেয়া হচ্ছে হকারদের | ছবি: এখন টিভি
0

রাজধানীতে দ্বিগুণ সংখ্যায় ফিরছে হকার। জীবিকার নামে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আবারও চলছে সড়ক ও ফুটপাত দখল। তবে এবার প্রশাসনিক মোড়কে। হকার কার্ড ও সাদা রঙ দিয়ে জায়গা নির্ধারণ করে বৈধতা দেয়া হচ্ছে অবৈধ স্থাপনাগুলোকে। সরকারের এমন উদ্যোগকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে আরও উৎসাহিত হবে হকাররা। যদিও প্রশাসন বলছে, সবই অস্থায়ী সিদ্ধান্ত।

হকার পুনর্বাসনে রাস্তা এবং ফুটপাতে সাদা রঙ দিয়ে এমন জায়গা নির্ধারণ করে দেয়া এখন টক অব দ্যা কান্ট্রি। এমন পদ্ধতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

রমনা ভবনের পেছনের এই সড়কটিতে হকারদের জন্য সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত জায়গা ফুটপাত পেরিয়ে পৌঁছেছে মূল সড়কের মাঝখানে। ৫০ থেকে ৬০ ফিটের সড়কের ৮টি লেনে ৫ ফিট বাই ৪ ফিট করে রাখা হয়েছে একেকটি দোকানের জায়গা, যাতে একেবারেই সংকুচিত যান চলাচলের জায়গা। তবে যাদের জন্য এতো আয়োজন সন্তুষ্ট নন তারাই।

হকাররা জানান, আমাদের আগের যে স্থান আছে, সেই স্থানে আমরা সন্তুষ্ট। লাগবে পাঁচ হাত, আর যদি দেয়া হয় দুই হাত, তাহলে এই দুই হাতে দোকানদারি করা যাবে?

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই করেই গেল মাসে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সিটি করপোরেশন। গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, বাড্ডাসহ সারাদেশে একযোগে বেশ শক্তভাবেই পরিচালনা করা হয় এই অভিযান। তবে অতীতের মতই নগরবাসীর আশায় গুড়ে-বালি। বরং এবার হকার কার্ড দিয়ে বৈধ তকমা দিয়েই বসানো হচ্ছে হকার। প্রশ্ন উঠছে, সড়কে বৈধ গাড়ি চলবে নাকি প্রশাসনিক বৈধ মোড়কে অবৈধ হকার।

পথচারীরা জানান, হকারদের জন্য একটা মার্কেট করা হতো, ওইখানে যদি হকারদেরকে পুনর্বাসন করা হতো তাহলে হকারদের জন্যও ভালো হতো।

গাড়িচালকরা জানান, যখন রাস্তাটা চিকন হবে তখন একসাইডের গাড়ি আসলে সমস্যাই হবে। হকাররা যখন রাস্তা অর্ধেক দখল করে ফেলে তখন জ্যাম হয়ে যায়। মাঝখানে দেয়ার উদ্দেশ্য কী? মাঝখান দিয়ে তো গাড়ি চলাচল করবে, রিকশা চলাচল করবে।

আরও পড়ুন:

শুধু নগরবাসীই নয়, সরকারের এমন পরিকল্পনাকে অপরিপক্ব ও অদূরদর্শী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নগরবিদ আদিল মোহাম্মদের মতে, সিটি করপোরেশনের এমন সিদ্ধান্ত সড়কে দখলদারিত্বকে আরও পাকাপোক্ত করবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘যেই সড়কে একজন ড্রাইভার অবৈধভাবে পার্কিং করলে জরিমানা দিতে হচ্ছে, সেই সড়কই অবৈধভাবে যারা হকার হিসেবে বসছে তাকে প্যাট্রন করা হচ্ছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এবং এটাকে এক ধরনের এই যে নতুন বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাকে কী করা হচ্ছে? এখানে স্থায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। আপনি চাইলেই যেকোনো জায়গাতে একটা সড়কের যেকোনো জায়গায় অনুমোদনহীনভাবে বসে যেতে পারেন—এই যে লাইসেন্সটা, এই লাইসেন্সটা কী করে? সারা বাংলাদেশের সকল গ্রামীণ এলাকায় সেখানে দরিদ্র এবং দরিদ্রহীন সেই মানুষগুলোকে কিন্তু ঢাকায় আসার ক্ষেত্রে প্রলুব্ধ করে।’

এসব প্রশ্ন কিংবা মন্তব্যের কোনো সদুত্তর পাওয়া গেল না সিটি করপোরেশন থেকে। ঢাকা দক্ষিণের প্রশাসক আব্দুস সালাম জানান, এই সিদ্ধান্ত অস্থায়ী। পরিবর্তন হতে পারে যে কোনো সময়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ‘এগুলো সব টেম্পোরারি। আমরা যেটা দিচ্ছি সেটাও মানে যে কারণে এখন পর্যন্ত আমরা পয়সা ফিক্সড করিনি। টাকা কত নেবো বা কি দেবো। তাদেরকে দেয়া হচ্ছে, তাদেরকে বলেই দেয়া হচ্ছে যে এটা টেম্পোরারি। সে নিউমার্কেটে ব্যবসা করুক, সে যাত্রাবাড়ীতে করুক যেখানেই করুক, সে সিটি করপোরেশনের ওই রেজিস্ট্রেশনের আওতায় তাকে আসতে হবে।’

কিন্তু এই পরিকল্পনা সড়ক দখলকারী চক্রকে আরও সুসংগঠিত ও স্থায়ী করবে বলে মনে করছেন এই নগরবিদ।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আর যদি হকারকে পুনর্বাসন বলেন, সেটা অবশ্যই রাস্তার মধ্যে তাকে ফেরত নিয়ে আসা। আমরা ঢাকায় যত দেখেছি যত নতুন রাস্তা হচ্ছে সব নতুন রাস্তাতেই হকাররা দখল করছে। রাস্তার লেন প্রশস্ত করা হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে, সেখানে হকার হচ্ছে। তাহলে এই যে পুরো শহরজুড়ে এত যে বাজার, পুরো ঢাকা শহরই তো বাজার। সেই বাজারের মধ্যে রাস্তার মধ্যে আরও নতুন বাজার যদি করা হয়, এটা তো আধুনিক পরিকল্পনা হতে পারে না।’

ফুটপাতে পথচারী আর সড়কে চলবে যান, এই প্রতিশ্রুতিতেই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি হয় সড়ক, মহাসড়ক। তবে বছরের পর বছর চলে আসা এই দখলদারিত্ব নষ্ট করে নগরবাসীর অবাধ চলাচল, ঘটায় দুর্ঘটনা। রাজনৈতিক পালাবদল হলেও বদলায় না এই সিন্ডিকেট। কর্মসংস্থানের নামে নষ্ট করা বৃহত্তর স্বার্থ উদ্ধার হবে কবে, তা এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলা প্রশ্ন।

ইএ