বাজেটে শ্রমিকের বৈষম্যের অবসান চাই: অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান | ছবি: সংগৃহীত
0

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেছেন, বাংলাদেশের বাজেটে সর্বদা শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হন। এবারের বাজেটে আমরা শ্রমিক বৈষম্যের অবসান চাই। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সবাই শ্রমিক অধিকারের কথা বললেও অতীতের সব সরকার শ্রমিকদের অধিকার হরণ করেছে। ফলে বিগত ৫৪টি বাজেটেই শ্রমিকদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে।

আজ (সোমবার, ১৮ মে) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কর্তৃক আয়োজিত ‘শ্রমিকের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক লস্কর মো. তসলিমের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য রাখেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খান, কবির আহমেদ, গোলাম রাব্বানী, মুজিবুর রহমান ভূঁইয়া, সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, মুহিবুল্লাহ, দপ্তর সম্পাদক নুরুল আমিন, ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

অধ্যাপক মুজিব আরও বলেন, বাজেট হচ্ছে প্রশাসক ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যকার একটি বার্ষিক অর্থনৈতিক চুক্তি, যা প্রতি বছর জাতীয় সংসদে পাস হয়। আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি সচল রাখার মূল শক্তি শ্রমিক সমাজ হলেও বাজেট প্রণয়নের সময় শ্রমিক প্রতিনিধি বা শ্রমজীবী মানুষের মতামত গ্রহণ করা হয় না এবং শ্রমিক কল্যাণ খাতে বরাদ্দও অত্যন্ত কম রাখা হয়।’

তিনি মনে করেন, বাজেট যদি একপক্ষীয় না হয়ে শ্রমিক ও প্রশাসনের উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করে প্রণয়ন করা হতো, তাহলে তা দেশের জন্য আরও কল্যাণকর হতো।

শ্রমিকের মর্যাদা প্রসঙ্গে তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী ও হাদিস উল্লেখ করে বলেন, ‘ইসলাম শ্রম ও শ্রমিককে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। মহানবী মুহাম্মদ (সা.) শ্রমিকের পরিশ্রমে কালো হয়ে যাওয়া হাত চুম্বন করে বলেছেন, ‘কাজের হাতই শ্রেষ্ঠ হাত।’

তিনি বলেন, শ্রমিকদের যথাযথ সম্মান ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।

সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশ ৫৪টি বাজেট দেখেছে এবং আগামী বাজেট পেশ হলে তা হবে ৫৫তম বাজেট। তিনি সংবিধানের ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলেন, সেখানে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও বাস্তবে আজও শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত।

তিনি অভিযোগ করেন, ৫৪ বছরেও শ্রমিকদের জন্য বাজেটে ১ শতাংশ বরাদ্দও নিশ্চিত করা হয়নি। ২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলনে বৈষম্যের বিরুদ্ধে জীবন দেওয়া ১৪৯ জন শ্রমিকের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেই বৈষম্য এখনো অব্যাহত রয়েছে।

নতুন সরকারের কাছে তিনি বৈষম্যহীন বাজেট প্রত্যাশা করেন এবং বলেন, গত পাঁচ বছরে শ্রম মন্ত্রণালয়ের জন্য সবচেয়ে কম বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অথচ দেশের শ্রমবাজারে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ নতুন শ্রমিক যুক্ত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের জন্য আনুপাতিক হারে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, অতীতে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কাজ করার সুযোগ পায়নি এবং নানা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তবে এখন তারা শ্রমিকদের পক্ষে সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেবে এবং সরকারকে আহ্বান জানায়—সাড়ে ৭ কোটি শ্রমিকের খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নের কথা বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে। অন্যথায় কেবল বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের সব শ্রমিক সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায় করা হবে। তিনি শ্রম মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী জাতীয় বাজেটে অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানান।

মতবিনিময় সভায় অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গার্মেন্টস ঐক্য জোটের সভাপতি মোহাম্মদ মেহতাব, প্রগতিশীল নির্মাণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. শহিদুল্লাহ চৌধুরী, বি আর ই এল-এর কার্যকরী সভাপতি মোহাম্মদ রেনারেল আলম, বাংলাদেশ গার্মেন্টস লেবার কংগ্রেসের নেত্রী মোছা. শামীমা আক্তার, গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের নেত্রী রাশিদা আক্তার, বাংলাদেশ ট্রাস্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এফ এম আবু সাঈদ, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তফা, কামরাঙ্গীরচর রিকশা-ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. আব্দুল হালিম, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি সাহিদা সরকার, শ্রমিক মজলিসের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম এরশাদ, ঢাকা ওয়াসা ঢাকা মহানগরী উত্তরের শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ মুন্সী, মাদারল্যান্ড গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সালেহা ইসলাম শান্তা, বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বেপারী, বাংলাদেশ অটোরিকশা হালকা যান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম ফারুক, প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুন্নাহার, ডেসকো শ্রমিক নেতা শেখ আব্দুল্লাহ, ডেসকো আউটসোর্সিং কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী, বাংলাদেশ শ্রমিক অধিকার পরিষদের সভাপতি মো. আব্দুর রহমান, বাংলাদেশ টি অ্যান্ড টি শ্রমিক-কর্মচারী আদর্শ ফেডারেল ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন জনি প্রমুখ।

এএইচ