বিপর্যস্ত জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাত: বাজেট সংস্কারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন শীর্ষক সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা
বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন শীর্ষক সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা | ছবি: সংগৃহীত
0

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। তাপপ্রবাহ, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ, পানিবাহিত সংক্রমণ, অপুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও সেই তুলনায় স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি ও অর্থায়ন পর্যাপ্ত নয়। সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের অংশ আরও কমেছে। এর প্রেক্ষিতে দেশের জলবায়ু-স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থায় জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজ (শনিবার, ৬ জুন) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।

সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), এইচইকেএস/ইপিইআর এবং সুশীলন যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সংলাপে ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অর্থায়ন: নীতিগত অঙ্গীকার ও আর্থিক বাস্তবতা’ শীর্ষক একটি গবেষণার তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, দেশের জলবায়ু-স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশেরই বেশি পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ২০২১-২২ অর্থবছরের ২.৭৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১.৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ প্রায় ২.৫ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৫ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের প্রকল্পনির্ভর অর্থায়নের ফলে রোগ নজরদারি, জরুরি প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু-স্বাস্থ্য গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সহনশীলতা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো প্রয়োজনীয় তহবিল পাচ্ছে না।

গবেষণায় আরও বলা হয়, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) ২০২৩-২০৫০ এবং স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) স্বাস্থ্য খাতকে অভিযোজনের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি। এইচএনএপি-এর হিসাব অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে।

অনুষ্ঠানে সিপিআরডি পরিচালিত ‘উপকূলীয় অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক অপর এক গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপদ পানির তীব্র সংকট এবং দারিদ্র্যের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে রয়েছেন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের প্রায় অর্ধেকই অনিয়মিত মাসিক, তীব্র ব্যথা, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণের মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে গর্ভপাত, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, সংক্রমণ, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার মতো জটিলতার বিষয়ও উঠে এসেছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮২.৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত উপকরণের সীমিত প্রাপ্যতা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক নারীর মধ্যে পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি)-এর লক্ষণ এবং গাইনোকোলজিক্যাল সংক্রমণের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

সংলাপে সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, ‘জলবায়ু অর্থায়ন এখনো একটি অস্পষ্ট ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন আকর্ষণ করতে হলে শক্তিশালী পরিমাণগত তথ্য ও গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।’ ‘জলবায়ু-স্বাস্থ্য আলোচনাকে শুধু নিরাপদ পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ইকবাল কবির বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী মোট জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে যায়। এটি প্রমাণ করে যে জলবায়ু-স্বাস্থ্য কেবল বাংলাদেশেই নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও অবহেলিত। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি শক্তিশালী অর্থায়ন প্রস্তাব তৈরি এবং তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা।’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব ড. শাহ আবদুল সাদী বলেন, ‘বৈশ্বিক সরকারি অভিযোজন অর্থায়ন এক বছরে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কমে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জলবায়ু বাজেট ট্যাগিং ব্যবস্থায় আরও সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ও খাতভিত্তিক মালিকানা প্রয়োজন।’ ‘তিনি জলবায়ু-স্বাস্থ্য বাজেটিং প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষীয় যাচাই ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন।’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও জাতিসংঘ অনুবিভাগ প্রধান এ কে এম সোহেল আহমেদ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় পুরোপুরি মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যার ফলে উদ্যোগগুলো বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।’ ‘তিনি উপকূলীয় অঞ্চল ছাড়াও দেশের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জলবায়ু গবেষণা সম্প্রসারণ এবং তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা জরুরি, তবেই বৈশ্বিক তহবিল থেকে অর্থ আনা সম্ভব হবে।’

সংলাপ শেষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় বাজেট প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার অগ্রাধিকারসমূহকে আরও শক্তিশালীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, জলবায়ু বাজেট ট্র্যাকিং ব্যবস্থা উন্নত করা, রোগ নজরদারি ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের জন্য পুনরাবৃত্ত অর্থায়ন বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্যখাত-নেতৃত্বাধীন অভিযোজন উদ্যোগসমূহের জন্য দেশীয় জলবায়ু অর্থায়নে অধিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

এএইচ