দেশে দাপিয়েছে বেড়াচ্ছে প্রায় ৬০ লাখের বেশি অটোরিকশা। এ অটোরিকশা সরাসরি বিদ্যুৎ টানছে জাতীয় গ্রিড থেকে। যার পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৪ কোটি ইউনিট। এবার জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে অটোরিকশা চার্জিংয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে প্রশ্ন হলো বিপুলসংখ্যক এ অটোরিকশা কী আদৌ সোলার চার্জিং ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব? আর আসলেও তা কোন পদ্ধতিতে?
ধরে নেয়া যাক, প্রতিটি অটোরিকশায় থাকবে নিজেস্ব সোলার প্যানেল। আর তা দিয়েই চলবে অটোরিকশা। কিন্তু ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশের গবেষণা বলছে, একটি অটোরিকশায় ২ বর্গমিটারের বেশি সোলার প্যানেল বসানো সম্ভব নয়। আর এ সোলার প্যানেল দিয়ে সারাদিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব মাত্র ০ দশমিক ৭ ইউনিট। কিন্তু একটি ল্যাইড এসিড ব্যাটারির অটোরিকশা চার্জ হতে প্রয়োজন প্রায় ৭-৮ ইউনিট বিদ্যুৎ। দেশের সড়কও নয় এ মডেলের অনুকূলে।
আইইউবির গ্রিন এনার্জি রিসার্স সেন্টারের পরিচালক খসরু মাহমুদ সেলিম বলেন, ‘বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের যে অবস্থা এবং যে রকম ঝাঁকি হয়, তাতে সোলার প্যানেল এখানে প্র্যাকটিক্যাল না। আমরা গবেষণা করে দেখেছি যে, একটা অটো রিকশার জন্য ফুল চার্জ হতে যেখানে ৭ থেকে ৮ ইউনিট বা ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ দরকার, কিন্তু ওই পুরা রিকশার ছাদ ব্যবহার করে সারাদিনে আপনি ১ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ পাবেন।’
প্রশ্ন হলো আর কোনো উপায় আছে কী?
গবেষকরা বলছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন সোলার চার্জিং স্টেশন। তবে এতেও আছে প্রতিবন্ধকতা। গ্রামে কিছুটা সম্ভব হলেও পর্যাপ্ত জায়াগার অভাব আছে শহরে। এছাড়া আছে বিপুল বিনিয়োগের ঝুঁকিও।
খসরু মাহমুদ সেলিম আরও বলেন, ‘চার্জিং স্টেশনের জন্য যদি আপনি স্টোরেজ ফ্যাসিলিটিসটা রাখেন, তাহলে খরচটা নরমাল খরচের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ হবে। ড্রাইভাররা সেটা অ্যাফোর্ড করতে পারবে কিনা—এ ব্যাপারটা একটু গবেষণা করে দেখা, আর অ্যানালাইসিস করে দেখা যেতে পারে।’
এদিকে নেট মিটারিং পদ্ধতি হতে পারে সম্ভাবনা। কিন্তু এখানেও প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ। যার খরচ একজন চালকের আয়ের তুলনায় অনেকটাই বড়।
অন্যদিকে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোলার চার্জিং স্টেশন ব্যবহার করে ব্যাটারি অদল বদল পদ্ধতিতেও এই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। তবে তাদের মতে এটিও বিপুল ব্যয় বহুল, যার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারি পর্যায়ে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হাদিঊজ্জামান বলেন, ‘আসলে কমপ্রিহেনসিভ মাস্টার প্ল্যান লাগবে, বিজনেস মডেল লাগবে এবং টেকনিক্যাল যে চ্যালেঞ্জগুলি আছে তা নিয়ে কিন্তু আগে ভাবতে হবে। এটা আসলে উদ্যোগটা সরকারের পক্ষ থেকে নেয়াটাই আমি মনে করি একটা ওয়ে আউট হতে পারে।’
গবেষক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাস্তবসম্মত অবকাঠামো ছাড়া আইনি বাধ্যবাধকতা চাপানো হলে তা মাঠপর্যায়ে ব্যর্থ হতে পারে। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, ব্যাটারি আধুনিকায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চার্জিং হাব গড়ে তোলার মাধ্যমেই অটোরিকশার এই রূপান্তর সম্ভব।
অন্যথায় শুধু কাগজে কলমে পরিকল্পনা থাকবে, কিন্তু বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডে চাপ কমানো অসম্ভব হবে।





